ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যা

মানুষ শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করতে চায় | ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যা

তরুণ চিকিৎসকের আত্মহত্যা:

মানুষ শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করতে চায়

(ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যা)


ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশ নামের এক প্রাণবন্ত তরুণ চিকিৎসকের আত্মহত্যার ঘটনায় গুমোট হয়ে আছে চারদিক। আন্তর্জাল কিংবা বাস্তব জীবন সবখানে চলছে একই কথা, একই বিষয়ে। সাত বছরের প্রেমের পরিণতি হিসেবে ২০১৬ সালে তানজিলা হক মিতুকে ভালোবেসে বিয়ে করেন আকাশ।

কিন্তু বিয়ের তিন বছর না যেতেই সেই ভালোবাসা ফিকে হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় দাম্পত্য কলহ। সেই কলহের সর্বশেষ পরিণতি ফেসবুকে স্ত্রীর ছবি, স্ক্রিনশট এবং শারীরিকভাবে আহত করে ভিডিও দেওয়া এবং সবশেষে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলা। তাঁর স্ত্রী তানজিলা হক মিতু যে নিজেও পেশায় চিকিৎসক। তাকে বর্তমানে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে কিছু বলতে গিয়ে মনে পড়ে যায়, কয়েকবছর আগে আমেরিকায় একজন মহিলার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। যার স্বামী এ দেশে আসার পর স্ত্রী, সন্তান থাকার পরেও অন্য এক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পরিচিত সেই মহিলাকে আমি যতবারই বলেছি, ‘এমন সম্পর্ক ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?  উত্তরে উনি বলতেন, ‘ছেড়ে দেব। তবে তার আগে আরেকটু দেখি। বুঝতে পারে কিনা দেখি। ছেড়ে তো যে কোন সময় দেওয়া যাবে। এর আগ পর্যন্ত চেষ্টা করে দেখি।’

মানুষ সম্ভবত শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করতে চায়। শেষ দেখতে চায়। ভাবে, হয়ত কিছু ঠিক হবে। হয়তবা নতুন করে শুরু করার কিছু থাকবে। সেই শেষটুকুর অপেক্ষায় যে নিজের ক্ষয় ধরে যাচ্ছে তা অনেকেই বুঝতে পারে না সেই ক্ষয় ঠেকানোর জন্য কী করনীয় তাও ভাবতে চায় না।

বর্তমানে যে তরুণ চিকিৎসক আত্মহত্যা করেছেন, তিনিও শেষ দেখার অপেক্ষায় নিজেকে শেষ করে ফেলেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে মেয়েটিকে বিয়ে করার আগেই তিনি জানতে পেরেছিলেন তাঁর সাথে প্রেমের সম্পর্ক চলার সময় মেয়েটি অন্য দুইটি ছেলের সাথেও জড়িয়ে পড়েছিল। মেয়েটির স্বীকারোক্তি এবং ততদিনে আসন্ন বিয়ের খবর অনেকেই জানে বিধায় সে সম্পর্ক না ভেঙে ধর্মীয় এবং সামাজিক পরিণতির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।

এই ক্ষেত্রে তরুণ চিকিৎসকের বিয়ের আগে প্রতারণার কথা জেনেও বিয়ে করাকে ভালোবাসা কম, সামাজিক, পারিবারিক চাপ, ইগো, এবং জেদই বেশি বলে মনে হয়েছে। প্রথমে অন্ধ আবেগে, লোকলজ্জার ভয়ে প্রতারণার ঘটনা জেনেও বিয়ে করেছেন, পরে লোকলজ্জার ভয়ে ডিভোর্স না দিয়ে স্ত্রীকে সামাজিকভাবে হেয় করে নিজেকেই পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছেন। 

আপাত দৃষ্টিতে বিয়ে দু’জন নারী পুরুষের জন্য একটি সামাজিক, পারিবারিক এবং ধার্মিক স্বীকৃতি মনে হয়। তবে মূলত বিয়ে কেমন বন্ধন কিংবা কেমন সম্পর্ক যারা এটিকে সত্যিকারভাবে ধারণ করে না তারা বুঝতে পারবে না। এ কথা পরীক্ষিত যে মানুষ মাত্রই বহুগামী।

তবে এটিও সত্য যে একজন মানুষের সাথে বিয়ে করে জীবন যাপন করা বহুগামীতাকে নিরুৎসাহিত করারই নাম। ভালো না লাগলে, সম্পর্কে না মানিয়ে চলতে পারলে বিচ্ছেদ আসতেই পারে। তবে কারও একাধিক সম্পর্কে থাকতে ইচ্ছে হলে, কিংবা বিয়ে ছাড়াই সম্পর্কে থাকতে ইচ্ছে করলে এমন কাউকে জীবনে না জড়ানোই উত্তম যে এই জীবনধারণ কে সমর্থন করে না। 

চিকিৎসক এই দম্পতির এই দুঃখজনক পরিণতির জন্য আমার চোখে তাঁরা দু’জনেই দায়ী। নারীবাদ কে মানবতাবাদের সাথে তুলনা করা হয়। বলা হয় নারীবাদ মানবতাবাদের আরেক রূপ। মানবতাবাদী কেউ তাই এ সত্যকে অস্বীকার করতে পারবে না। আমিও সে কারণেই বলি, নারীবাদের নামে আমি প্রতারণাকে সমর্থন দিতে পারব না। কারণ এটি ভুল হবে। জগতে যা কিছু মন্দ, তা নারীর জন্যও মন্দ এবং পুরুষের জন্যও মন্দ। জীবন সঙ্গীর গায়ে হাত তোলা পুরুষের জন্য যেমন উচিৎ না, নারীর জন্যও উচিৎ না।

যারা আধুনিকতার নামে নারীর বহুগামিতাকে স্বাগত জানান, কিংবা ঢালাওভাবে তাঁদের দোষ বা ভুলকে অস্বীকার করেন, তাদেরকে আমার গিরগিরটির মতো মনে হয়। যারা ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাতে পারে। কারণ, এরাই আবার নিজের বাবা, ভাই, স্বামী, সহকর্মীর বহুগামীতাকে ধিক্কার দিবে।

‘Je ne suis pas un homme facile’ ফ্রেঞ্চ ভাষার একটি সিনেমা (যার অর্থ দাঁড়ায় ‘আমি একজন সহজ মানুষ নই’) আমি দেখেছিলাম কিছুদিন আগে। যেখানে দেখিয়েছিল ছোট্ট একটা ঘটনার পর কিভাবে একজন তরুণ পুরুষশাসিত সমাজ থেকে এমন এক সমাজে চলে যায় যেখানে শুধুই নারীদের জয়জরকার এবং শাসন। সেখানে ভুক্তভোগী হচ্ছে পুরুষরা।

সিনেমা কিছুদূর আগালেই দেখা যায় তা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অর্থাৎ এক সমাজে নারীকে পণ্য করা হচ্ছে তো অন্য সমাজে পুরুষকে পণ্য করা হচ্ছে। উভয় জগত একই রকম। বিষাক্ত এবং অশান্ত। তাই লিঙ্গভেদে আসলে অপরাধকে বিচার না করে অপরাধ দিয়ে মানুষকে বিচার করা প্রয়োজন।

আকাশ নামের সেই তরুণ চিকিৎসক নিজেও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না। জীবন সঙ্গীর প্রতারণা নিয়ে কারও স্বাভাবিক থাকতে পারার কথাও না। তবে তাকে মহান প্রেমিক বা স্বামী বলা যায় না। এমন না যে এই প্রথম তিনি এমন কিছু জেনেছিলেন। আগেই তো অতীত জেনে, বিয়ে করেছিলেন।

তারপরেও এ সময়ে এসে নিজের জীবন, নিজের মা, ছোট ভাই ও পরিবারের চেয়ে স্ত্রীর প্রতারণা নিয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে গেলেন।  স্ত্রীকে মারধোর করলেন, সামাজিক মাধ্যমে তথ্য ছড়ালেন এবং নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেন। সেই সাথে নিজে মারা যাবার আগে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেলেন যেন তার স্ত্রী বেঁচে থাকলেও সার্বিকভাবে সবাই মেয়েটির মৃত্যুর কথাই ভাবে। এই সব কিছুর একটিও উনি ঠিক করেননি বা সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানুষের মতো করেননি। 

চাইলে অনেক ভিন্নভাবে কিছু না কিছু করা যেত। মৃত্যু বাদে সবকিছুই করা যেত কিন্তু উনি চাননি। আকাশ তাঁর বিয়ের ভিডিওতে মায়ের জন্য ভালোবাসার কথা বলতে বলতে আবেগে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। সেই ভিডিও এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকের হোম পেইজে। সন্তান হিসেবে মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে কি তিনি বাঁচার চেষ্টা করতে পারতেন না?

যিনি পেশায় চিকিৎসক, যার সেবায় প্রাণ পায় অনেক রোগী, আরও অনেকের জীবন বাঁচানোর প্রত্যয়ে কি তিনি বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে পারতেন না? এত দায়িত্বশীল একটি পেশায় তো তাঁর মতো এমন তরুণদের আরও দরকার ছিল। একই সাথে আকাশের আসলে একজন বন্ধুর প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল কাউন্সিলিংয়ের। শুধু আকাশের নয়, তার স্ত্রী মিতুর ও। মিতুও কেন শিক্ষিত একজন স্বাবলম্বী নারী হয়ে এত অস্বচ্ছ এবং মানসিকভাবে অস্থির এবং অপরিণত হবেন? সম্পর্কে বিচ্ছেদ সুন্দর হবার দরকার নেই, তবে নূন্যতম স্বাভাবিক এবং সম্মানজনক হতে পারে!

আগে প্রচলিত ছিল, পুরুষ মানুষের চরিত্রে সমস্যা থাকবেই। সময়ের সাথে সাথে তা আবার ঠিক হয়ে যাবে। এখন অনেকে বলছে এতদিন পুরুষ একাধিক নারীর সান্নিধ্যে ঘুরে বেড়াত, তাই এখন নারীরা এমন করবেই। এই বিষয়গুলো আগেও ঠিক ছিল না। এখনও নেই। মন্দ কিছুতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া মানে মূলত অনেক বেশি পিছিয়ে যাওয়া। এই বিষয়টি আমরা বুঝি কয়জন? 

একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আকাশ ও মিতুর বিয়ের দেনমোহর ৩৫ লক্ষ টাকা। দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষ একসাথে জীবন শুরু করতে যাবে। সেখানে সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দেনমোহর ধরার কী যুক্তি থাকতে পারে? উপহারের নামের যৌতুকের মতো দেনমোহর নিয়ে সামাজিক মর্যাদা দেখানো এবার বন্ধ করা উচিৎ। শিক্ষিত, কর্মক্ষম নারীর জন্য একরকম দেনমোহর আর তা না হলে অন্যরকম। এমনটাই হওয়া উচিৎ। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, কাছের বন্ধু বা চেনা কাউকে কোন কিছু নিয়ে অস্থির দেখলে তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা। 

ফেসবুকের ছবি এবং স্ট্যাটাস দেখে অনেক সময়ই মনের ভেতরের ক্ষরণ বোঝা যায় না। সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সান্নিধ্য পেলে হয়ত আর কোন প্রাণকে অসময়ের চলে যেতে হবে না।


মাহরীন ফেরদৌস

তরুণ কথাসাহিত্যিক

লেখকের আরও লেখা পড়ুন: ভুলে থাকার গল্প


 

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *