ছোটগল্প: মৃত সুখী নগর

মৃত সুখী নগর: আখতার মাহমুদের ছোটগল্প

আখতার মাহমুদের ছোটগল্প:


ছোটগল্প: মৃত সুখী নগর

আখতার মাহমুদ


বহুকাল আগে নয়, এই কিছুদিন আগেও একটি সুখী নগর মৃত নগরীতে বদলে গেছে। বিস্ময়-ব্যথায় আমরা বিশ্বকাপ ফুটবল জ্বরাক্রান্ত পৃথিবীর মানুষ, ফাইনাল খেলাটিও শেষ হয়ে গেলে জেনেছি, সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার যুগেও নীরবে বিলীন হয়ে যাওয়া বেশ সহজ। আমরা চরম উন্নতির এই যুগে এসে ব্যথার উপশম নিয়ে ব্যস্ত নই, আমাদের হাজারো কাজ পড়ে আছে। আমরা বরং ব্যথা প্রকাশেই ব্যস্ত। নগরটির হয়তো কোনো নাম আছে… তবে, এটি আমাদের ব্যথা অথবা এটির ইতিহাস আমাদের আহত করে বলে এবং ব্যথাকে বা আমাদের আহত হয়ে ওঠা সুন্দরতম উপায়ে প্রকাশের নিমিত্ত আমরা একে কেবল মৃত সুখী নগর বলেই জানব। ডাকব।

নগরটি আলোচনায় আসে নয়নাভিরাম ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে বিবৃতি না দেয়ায়। সবদেশ উচ্ছ্বাস জানিয়ে বিবৃতি দিলেও বাদ পড়ে গেছে এই সুখী নগরটি। কেন? …. এই প্রশ্ন আমাদের কাছে বিশাল হয়ে ওঠে। এটা রীতিমত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে হুমকিসম প্রশ্ন। কেন তারা বিবৃতি দেবে না? তাদের মন নেই? উচ্ছ্বাস নেই? তারা কী জঙ্গী নগরের বাসিন্দা? সাংবাদিক বন্ধুরা সমস্ত পৃথিবী থেকে ছোটেন সেই সুখী নগরে। নগরটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উৎসব শেষে আনন্দবার্তা পাঠায়নি, এর চেয়ে হঠকারী বিষয় আর কী হতে পারে? সাগরবেষ্টিত দ্বীপ নগরটির ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থানই কি এর নাগরিকদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে? ওদের মানসিকতাও বিচ্ছিন্ন আর পিছিয়ে পড়া হয়ে গেছে?

সাংবাদিকরা পৃথিবীর সমস্ত প্রান্ত থেকে ছুটে এসে সে নগরে পৌঁছে দেখেন সমস্ত নগর নিষ্প্রাণ। একটি মাত্র মৃতপ্রায় জীবিত মানুষকে দেখা যায় নগরের একমাত্র প্রবেশপথে। সে লুটিয়ে পড়ে আছে ভাঙা পা নিয়ে। সে কথা বলতে পারে না। মানুষটিকে দুর্ভিক্ষ পীড়িত ভূতের মত দেখায়। তাকে ঘিরে সাংবাদিক বন্ধুরা প্রশ্ন রাখেন ফুটবল বিশ্বকাপ শেষে নগরের বিবৃতি না রাখা বিষয়ে। সকলেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই প্রশ্নটা করেন। নানা প্রকারে একই প্রশ্নের তীব্রতায় হয়তো মানুষটি তাড়াতাড়ি তার হাতের একতাড়া কাগজ কোনো একজনের হাতে তুলে দিয়ে নিঃশ্বাস হারিয়ে স্থির হয়ে পড়ে। অথবা এতজন মানুষ একসাথে দেখে তার দুর্বল হৃদয় উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়াতেই হয়তো দম ছেড়ে দেয়। অথবা… সাংবাদিক বন্ধুরা কেউ কেউ বলেন, লোকটা অকারণেই তাড়াহুড়ো করে মরেছে। লাইভে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাওয়া তার পক্ষে কঠিন হতো না মোটেও। মানুষ বড্ড অস্থির।

কাগজগুলোতে হয়তো বিবৃতি থেকে থাকবে এমন আশায় তীক্ষ্ন চোখ বোলায় সাংবাদিক বন্ধুরা। কিন্তু তাতে বরং মেলে নগরীর শেষ মৃত ব্যক্তিটির জীবনী… না ঠিক জীবনী নয় বরং সেটিকে বলা চলে মৃত সুখী নগরটির চূড়ান্ত ইতিহাস। সাংবাদিক বন্ধুরা বেশ চটপটে বলে এই নিরস ব্যাপারটিকেই ব্রেকিং নিউজ করে তোলেন। সমস্ত বিশ্বে হাজারো চ্যানেলে মৃত সুখী নগরী লাইভে আসে। মধুকণ্ঠী যুবক-যুবতীরা, যারা সবকালে সবদেশে তরুণ-সুন্দর এবং অবশ্যই মধুকণ্ঠী বা শুনতে ভাল তারাই চিরকাল সংবাদ পাঠক বলে বা কালো-হোৎকা-অসুন্দর-শ্বেতরোগী-এসিডপোড়া-অতিবৃদ্ধ মুখের কেউ টিভি চ্যানেলে সংবাদ পাঠের উপযুক্ত বিবেচিত হয় না বলেই কেবল আমরা স্বস্তিতে মৃত সুখী নগরীর একঘেয়ে ইতিহাস শুনি। নইলে মৃত সুখী নগরের ইতিহাসে আমাদের কাজ কী? আমাদের তো ঢের কাজ পড়ে আছে…. সংবাদ পাঠকের তরুণ আকর্ষণীয় মুখশ্রীই মূলত মৃত সুখী নগরের ইতিহাসে আমাদের আগ্রহী করে তোলে।

কাগজের লেখাগুলো পড়ে শোনায় লাইভে সাংবাদিক ও সংবাদ পাঠক মিলে-মিশে।  ক্যামেরা ঘোরে নগরীর গলি, মাঠ, বিরান রাস্তায়। থেমে থেমে নিজস্ব ব্যাখ্যা যুক্ত করেন সাংবাদিক বন্ধুরা এবং সংবাদ পাঠক। সেসব আলাদা মাত্রা যোগ করে সংবাদে। সংবাদ পাঠকের ঠোঁটের নানান মোচড়, চোখের তারার সংকোচন বা প্রসারণ; তাদের নাকের ফুটোর সাবলীলভাবে বড়-ছোট হয়ে ওঠা ইত্যাদিও আলাদা রেশ এনে দেয় সংবাদে। শেষতক দেখা যায় সংবাদ বেশ নাটকীয় হয়ে ওঠে, এবং জীবন্তও। আমরা যেন দেখতে পাই মৃত শেষ ব্যক্তিটি যেন দাঁড়িয়ে গেছেন আমাদের চোখের সামনে।

লাস্যময় সংবাদ পাঠকের গুণে আমরা যেন চোখের সামনেই দেখি কথা বলছেন তিনি হাত নেড়ে নেড়ে, বিষণ্ন চোখ মাটিতে নামিয়ে। তিনি আমাদের নাটকীয় ভঙ্গিতে যেন নিজমুখেই জানান- তিনি ব্যবস্থাপকের চাকুরি করতেন। দীর্ঘদিন ধরে নগরীর একমাত্র, কিন্তু অফুরন্ত কয়লাখনির ব্যবস্থাপক হিসেবে কাটিয়েছেন। এই কয়লাখনিটি নগরের প্রাণ, নগরের সবকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এই কয়লাখনির উপরেই নির্ভরশীল। কয়লা, নগরের প্রধানতম জ্বালানি। অফুরন্ত কয়লা তাদের দিয়েছে অফুরন্ত বিদ্যুৎ। অফুরন্ত বিদ্যুৎ দিয়েছে অফুরন্ত অবসর। অফুরন্ত অবসর দিয়েছে বিলাসিতা। বিলাসিতা- অফুরান ভোগবস্তু।

কখনোই ব্যবস্থাপক একটি বাড়িতে সন্তুষ্ট থাকেননি। তার দরকার হয়েছে দশটি বাড়ির। একটি গাড়িতে কাজ চলে না ভেবে কিনেছেন আরো পাঁচটা গাড়ি। তবুও কি পোষায়? একটা ইয়ট, একটা হেলিকপ্টার না হলে মর্যাদা বাড়ে কারো? কিন্তু একজন ব্যবস্থাপকের সারা জীবনের বেতন দিয়েও কি হেলিকপ্টার, ইয়ট, একাধিক বাড়ি-গাড়ি হয়?

অংকটা সরল। নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কয়লাখনি থেকে কয়লার উৎপাদন দ্বিগুণ করেন তিনি এবং কাগজপত্রে হিসেবটা লেখা হয় অর্ধেক। দ্বিগুণ উৎপাদনের অর্ধেকটা ঠিকঠাক মতই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে চলে যেত। বাকি অর্ধেক ইটভাটা এবং নানাদিকে প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ভাগ করে দেয়া হতো। তবে কাগজে লেখা নগরের চূড়ান্ত ইতিহাস জানায়, ব্যবস্থাপকের লেনদেনের হাত বেশ পরিষ্কার, হিসেবে পাকা মাথা। যারা যারা তার সাথে শ্রম-মেধা দিয়ে গেছে তাদের প্রত্যেকেই কয়লা বিক্রির টাকা পেয়েছে। ট্রাক ড্রাইভার হতে শুরু করে, ছাত্রনেতা, নিরাপত্তা বাহিনী, এমনকি টকশো তারকাও নিয়মিত ভাগ পেয়েছে। এই প্রক্রিয়া তিনি বছর পনেরো ধরে চলমান রেখেছেন। শেষতক ওটাই হয়েছে স্বীকৃত পদ্ধতি।

মৃত সুখী নগর
মৃত সুখী নগর

 

প্রত্যেককে সন্তুষ্ট রেখেছেন তিনি। কিন্তু কে জানতো খনিটা অমন বেঈমানি করবে? খনি ব্যবস্থাপক কী করে জানবেন, সে আর কিছুই লুকিয়ে রাখেনি। সমস্তটাই উজাড় করে দিয়েছে ভোগের জন্যে? কয়লা শেষ হয়ে যাবার দায় সকলে ব্যবস্থাপকের ওপরেই চাপাতো, কিন্তু প্রকৃতি সে সুযোগ দেয়নি কাউকে। প্রত্যেকেই নিজেরা মরে খালাস হয়ে গেছে। যদিও তাকে একাধিকবার দাঁড়াতে হয়েছে বিচারের মুখোমুখি। পর্যাপ্ত পরিমাণ উপহার সামগ্রী বিতরণের সুবাদে নয় বরং উপযুক্ত দেশপ্রেম দেখানোর ফলেই কোনো প্রমাণ মেলেনি তার বিরুদ্ধে। তবে তিনি ততদিনে বিষণ্ন হয়ে পড়েছেন। উপলব্ধি করতে পেরেছেন কিছু একটা আসছে। ভয়ানক কিছু।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মাত্র দু’সপ্তাহ চলেছে সমস্ত জ্বালানি দিয়ে। এরপরে একফোঁটা তেল বা গ্যাস বা একটুকরো কয়লা কোথাও অবশিষ্ট থাকেনি। শেষতক নগরীর মানুষেরা সবগুলো গাছ কেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। গাছগুলোও ফুরিয়ে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ ছাড়া ভেঙে পড়ে যোগাযোগব্যবস্থা। তারচেয়েও করুণ হয়ে পড়ে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ ছাড়া পানি উঠে না। তাদের নদী নেই। পুকুরগুলো বৃষ্টির অভাবে শুকিয়ে যায়। সেচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাষও বন্ধ হয়ে পড়ে। খাবার পানি ফুরিয়ে গেলে টপাটপ মানুষেরা মরতে থাকে। ব্যবস্থাপক লিখে গেছেন- তিনি বস্তা বস্তা টাকা নিয়ে ছুটেছেন একগ্লাস পানি কিনতে। তার স্ত্রী, সন্তানরা বাড়ি-গাড়িগুলো দেখে দেখেই টাকার ওপর শুয়ে খাবার-পানির অভাবে মারা গেছে, ওসব খাওয়া যেত না তবুও মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা ওসব আঁকড়ে ধরে থেকেছে।

নগরীর কেউ কেউ মৃতদেহ খেয়ে টিকে থেকেছে দিনের পর দিন। মৃতদেহগুলোও নিঃশেষ হয়ে গেলে ক্ষোভে মরে গেছে মানুষেরা।

 

এত কিছু ঘটেছে কিন্তু, নগরপ্রধান কী করেছেন? এই প্রশ্নটা আমাদের মনে উদয় হতে পারে ভেবে ব্যবস্থাপক নিজেও মৃত সুখী নগরীর চূড়ান্ত ইতিহাসে লিখে গেছেন নিজের প্রজ্ঞাময় কিছু পর্যবেক্ষণ।

তিনি পর্যবেক্ষণে বলেছেন-

আমরা, জৈবিক তাড়নাতেই হারতে পছন্দ করি না। আমরা ঢেকে রাখি আমাদের পরাজয়। এটা কিন্তু দারুণ সাহসী কাজ। নগর প্রধান সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিশ্ববাসীকে আমাদের দুর্দশা না জানিয়ে। আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারতাম না পৃথিবীর করুণাময় দৃষ্টি। আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি হিসেবে কখনোই জানান দিতে পারতাম না পৃথিবীকে যে, আমাদের কয়লা নিঃশেষ হয়ে গেছে। আমরা বিদ্যুৎহীন যুগে ফিরে যাচ্ছি। আত্মসম্মানবোধ আমাদের তীব্র হওয়ায় নগরপ্রধান আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাইরের সাথে সকল রকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় বরং দুরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমাদের সমস্যা আমরা নিজেরাই সমাধান করব বলে স্থির করি। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি, নতুন অফুরান কয়লার খনি আবিষ্কারের। একটি নতুন খনিই আমাদের কেবল টিকিয়ে দিতে পারে। হয়তো বাইরের সাহায্য চাওয়া যেত, কিন্তু আমরা যে হার না মানা জাতি! আমরা কী করে পৃথিবীকে জানাতাম, আমাদের কয়লা ফুরিয়ে গেছে? যদিও হিসেবমতে আরো দীর্ঘদিন আমাদের কয়লা শেষ হবার কথা নয়?

শেষদিকে, মানুষেরা টুকটাক মরতে শুরু করলে কিছু মানুষ গলা বড় করে প্রতিবাদ করলে আমরা বিরক্তই হয়ে পড়ি। গলা এত বড় করার মানে হয় কোনো? তবে আমাদের বিশেষ হাতুড়ি বাহিনী- নগরের স্বেচ্ছাসেবক, হাতুড়ি দিয়ে গলা বড় করা মানুষদের গলা ছেঁচে দিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে।

আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন নগরপ্রধানের বিরোধী পক্ষ কী করেছে? আপনাদের সদয় জ্ঞাতার্থে জানানো উচিত যে, তারা একটি অভিনব পন্থা অবলম্বন করেছে। তারা নীরব থেকে তাকিয়ে থেকেছে সাধারণের মুখে। তারা আশা করেছে, বিরোধী পক্ষের হয়ে সাধারণ মানুষ এই দুর্যোগের সময়ে নগরপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। কিন্তু সাধারণেরা বরং নগরপ্রধানকেই বেশি ভালবাসতো। তারা নগরপ্রধানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নির্বিকার মরে গেছে একে একে। এছাড়াও তারা পুরোনো দিনের গল্প করেছে মৃত্যুর আগে। তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে এবং শেষতক মরে গেছে।

আপনারা আরো প্রশ্ন করতে পারেন- তরুণরা কী করেছে? এই দুর্যোগে তাদের ভূমিকা কী। আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, তরুণরাই সবচেয়ে দারুণ কাজ করেছে। তারা বিদ্যুৎ থাকাকালীন সময়ে সিনেমা-পর্ণ ইত্যাদি ডাউনলোড করেছে, প্রকাশ্যে চুমু খেয়ে প্রতিবাদ করেছে এই দুর্যোগে, তারা একে অন্যের নিকট কয়লা গায়েব হয়ে যাবার খবর শেয়ার করেছে, প্রেমিকার জন্যে ফুল কিনেছে এবং শেষতক একে একে মরে গেছে। কেউ কেউ প্রেমিকার গলা জড়িয়ে ধরেই মরে গেছে। সেইসব মৃত্যু অদ্ভুত সুন্দর। প্রেমিকার গলা জড়িয়ে প্রেমিক মরে যাচ্ছে এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বোধহয় পৃথিবীতে নেই।

ধার্মিকরা, ধর্মগুরুরা কী করেছে এই প্রশ্নও আপনারা করতে পারেন। তাদের বিদেহী আত্মার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে আপনারা জেনে রাখুন- তারা দুর্যোগকালীন সময়ে একে অন্যের ত্রুটি খুঁজে বেড়িয়েছেন এবং একে অন্যের সকল ত্রুটি খুঁজে বের করার পূর্বেই মরে গেছেন। অন্যের ত্রুটি খুঁজে বের করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, ত্রুটি সংশোধনে শুদ্ধতা আসে। সেই অর্থে আমাদের ধর্মগুরুরা, ধার্মিকরা শুদ্ধতার খোঁজে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন।

তবে শেষতক কিছু অর্বাচীন মানুষ চেয়েছে, পালিয়ে যেতে। কিন্তু শেষদিকে সকলেই হাতুড়ি বাহিনীতে নাম লেখানোয় কেউ কাউকে বাইরে যেতে দেয়নি। প্রত্যেকেই হাতুড়িপেটা করে একে অন্যের পা ভেঙে দিয়েছে। ফলে ভাঙা পা নিয়ে কেউ নগর ছেড়ে পালাতে পারেনি। আমার হাতেও গুটিকয়েক পা ভাঙা পড়েছে। আমারটাও ভেঙেছে কেউ একজন নগরের প্রবেশ ফটকের কাছে। অবশ্যই পালানোর উপায়ওতো কেউ জানতো না। প্লেন আকাশে ওড়াবার জ্বালানি নেই, জাহাজ চালাবার তেল নেই, নৌকা বানানোর গাছ নেই…. কেমন করে সাগর বা আকাশ পাড়ি দিয়ে পালাতো মানুষেরা? এছাড়াও বাইরের কেউ কেন দুর্যোগকালীন সময়ে খোঁজ নেয়নি সেটাও এক রহস্য আমাদের কাছে।

শেষতক আমার প্রাণ বাকি থেকে গেছে, সকলে নিঃশেষ হয়ে যাবার পরও। আপনারা আমাকে দায়ী করতে পারেন দুর্যোগের জন্যে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, কয়লাখনির শ্রমিকেরা উৎপাদিত কয়লার পরিমাণ আমাকে কমিয়ে বলতো এবং আমি সরল মনে বিশ্বাসও করতাম। আমার কাছে তথ্য আছে, তারা জাঙ্গিয়ার মধ্যে কয়লা লুকিয়ে পাচার করেছে। অথচ এতে করে তারা কেবল আমাকে নয়, ঠকিয়েছে নগরের সকলকে। তাতে লাভ হয়েছে তাদের ক্ষণিকের। সে লাভ বুমেরাং হয়ে ফিরেছে। নগরের শেষ মানুষ হওয়ার সুবাদে আপনাদের নিশ্চিত করে জানাতে পারি ঠকানোর কারবার একটা চক্র।

আপনি অন্যকে ঠকাবেন, সে ঠকাবে আপনাকে কোনো না কোনো ভাবে। আমার ঠকানোর বিষয়টা আসলে ভিন্ন, কাউকে ঠকানো আমার উদ্দেশ্য নয় কখনোই। আমি কেবল একটা পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছি যেটা আরো অনেককে সুখী করবে। তবুও আপনি যদি একে ঠকানোই বলেন, তবে তা-ই হোক। ধরে নিন আমার দ্বারা ঠকেছে সাধারণেরা। কিন্তু সারাজীবন কি তারা আমাকে ঠকায়নি? তারা কি নানান কার্যকারণ দেখিয়ে গাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেয়নি? তরকারীর দাম বাড়ায়নি? ঔষধে ভেজাল মেশায়নি? মাদকের প্রসার ঘটায়নি? পারিশ্রমিক বেশি চায়নি? আমার সম্পদ চুরি করেনি?

আর এই যে, ব্যবস্থাপকের চাকরিটা, এটা পেতেও কি আমার বাবাকে বিশাল অঙ্কের উৎকোচ খরচ করতে হয়নি? বাবাকে টাকাটা ফেরত দেয়া নিশ্চয়ই সন্তানের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? আর সে দায়িত্ব পালনে আপনি মাথামোটা হলেও চোখ বুজেই উপলব্ধি করবেন, নিয়মিত মাসিক বেতন কোনো সাহায্য করে না।

আবারো বলব। এটা এক চক্র। চক্রটা সহজে বুঝতে চাইলে, ধরে নিন- শ্রমিক ঠকিয়েছে বীজওয়ালাকে। বীজওয়ালা কৃষককে, কৃষক মাছওয়ালাকে, মাছওয়ালা মধ্যবিত্তদের, মধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্তদের, উচ্চবিত্তরা তাদের প্রভুদের। প্রভুরা শ্রমিকদের…..

এই মৃত সুখী নগরীতে শেষ বেঁচে থাকা মানুষ হয়ে আমার মনে হয়েছে, নগরীর চূড়ান্ত ইতিহাস পৃথিবীর মানুষকে জানানো প্রয়োজন। এটা এ কারণে নয় যে, তারা আমাদের জন্যে সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে কিংবা আমাদের অন্যকে ঠকানোর দারুণ সব পদ্ধতি রয়েছে। এই ইতিহাস এ কারণে যে, এতে করে পৃথিবী আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ ও মৃত্যুকে বরণ করে নেয়ার মত মহত্ত্বকে আবিষ্কার করবে পরম শ্রদ্ধায়। শেষ বেলায় এই শ্রদ্ধাটুকুই আমার আপনাদের কাছে কাম্য। যদি এই ইতিহাস কারো হাতে পড়ে তবে জানবেন- আমরা মাথা উঁচু করে মরেছি। সাহায্য প্রাপ্তির জন্যে লালায়িত হইনি। বিদায়…

টিভিতে স্বপ্নীল ভাসা ভাসা ক্লান্ত মরা চোখের সংবাদ পাঠক মসৃণ ঠোঁট নেড়ে পড়ে যাওয়া সংবাদ শেষে শিহরিত হই আমরা। মৃত সুখী নগরীর চূড়ান্ত ইতিহাস জেনে আমরা ব্যথিতও হই। চোখে জল গড়ায় আমাদের। যেহেতু আমরা চরম উন্নত সময়ে বাস করি, আমাদের চোখের জল দ্রুত গড়িয়েই থামে। আর মৃত সুখী নগরীর চূড়ান্ত ইতিহাসটি ডাউনলোড করে আমাদের কম্পিউটারের কোণায় আর্কাইভ করে করে রেখে দিই। কখনো ইস্যুর ঘাটতি পড়লে ইতিহাসটি তুলে আনা যাবে আলোচনার্থে। তবে সৌভাগ্যের বিষয়, আমাদের উন্নত পৃথিবীর মানুষের আজকাল কখনোই ইস্যুর ঘাটতি পড়ে না।


আখতার মাহমুদের ছোটগল্প: মৃত সুখী নগর

কেমন লেগেছে আপনাদের? 


আরও গল্প পড়ুন-

মাহরীন ফেরদৌসের গল্প | ভুলে থাকার গল্প

মুখোশমানুষ: আশরাফ জুয়েলের ছোটগল্প

দাগ | মেহেরুন নেছা রুমার গল্প

 

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *