ইশরাক পারভীন খুশির ছোটগল্প

মা, মন্টু আর গুগোল: ছোটগল্প | ইশরাক পারভীন খুশি

ইশরাক পারভীন খুশির ছোটগল্প:


মা, মন্টু আর গুগোল

ইশরাক পারভীন খুশি


ঘরটি মাঝারি আকারের, যার দেয়ালটা হালকা বেগুনী আর আকাশির মিশ্রণে একটা সুন্দর রঙের আবরণে ঢাকা। দেয়ালে ঝুলছে মন্টুর জন্মের পর থেকে এক বছর বয়স পর্যন্ত সময়ে বিভিন্নভাবে ঘুমানোর ছবি। যেমন কোনটা উপুড় হয়ে ব্যাঙের মতো করে, কোনটা বালিশের উপর পা আর মাথা উল্টা দিকে, কোনটা সিজদা দেয়ার ভঙ্গিতে আবার কোনটা হাত পা টান করে মার্চ করার মতো।

মা সবগুলো ছবির কম্পোজিশন করে বড় পোস্টারের মতো বাঁধিয়ে রেখেছেন। তার সাথে আরও আছে মন্টুর চার বছর বয়সে ফটোগ্রাফার দিয়ে তোলা খুব সুন্দর কতগুলো ছবি। ওর নিজের হাতে করা সৃজনশীল অনেকগুলো শিল্পকর্ম- যেমন রঙিন স্কচটেপ জোড়া দিয়ে দিয়ে রোবট আকৃতির ছবি, ওর আঁকা টুকটাক কিছু ছবি, স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবি ইত্যাদি।

একটা বুকসেলফ, ওয়ারড্রব, পড়ার টেবিল, টেবিলের উপর ফুলদানিতে ফুল, নীল আর সবুজ দুটি চেয়ার, সাজানো খেলনা সামগ্রী, ড্রয়ার ভর্তি ট্রান্সফরমার রোবট, গাড়ি, বিভিন্ন রকম মেধা যাচাইয়ের খেলনা সামগ্রী। সেলফ ভর্তি গল্পের বই আর একটা দোতলা খাট।


মন্টুর ঘরটা মা খুব সুন্দর করে গুছিয়ে দিয়েছেন, দোতলা বিছানায় নরম তুলতুলে ওর প্রিয় কম্বল আর কম্বলের ভেতর রোবট আকৃতির কোল বালিশটা দিয়ে দিয়েছেন, যাতে মন্টু ঘুমের সময় প্রিয় জিনিসটাকে নিয়ে কিছুটা উষ্ণতা অনুভব করে।

এই প্রথম মন্টু একা ঘুমাবে। এর আগে কখনো মা বাবার কাছ থেকে একদিনের জন্যও মন্টু আলাদা বিছানায় ঘুমাইনি। বিশেষ করে মাকে ছাড়া ঘুমানোর কথা মন্টু একদম ভাবতেই পারেনা। ছয় বছর বয়স থেকেই মা বাবা ওকে আলাদা নিজস্ব বিছানায় ঘুমানোর কথা বলতে শুরু করেন।

যখন মা বলেছেন, বাবা তুমি বড় হয়ে গেছো, এখন থেকে তোমার নিজের ঘরে নিজের বিছানায় ঘুমাতে হবে।

তখনই মন্টুর উত্তর, আম্মু আমি ছোট, আগে আমার বয়স দশ হোক তখন শোব।

মা মিটিমিটি হাসে আর ভাবে তোকে আলাদা বিছানা দিলে আমারই তো ঘুম হবেনা রে পাগলা! কি যে কঠিন তোকে একটু একটু করে ছেড়ে দেয়া! 

প্রথম যেদিন নাড়ির বাঁধন কেটে তুই আমার কোলে এলি সেদিনের সব কষ্ট, দশ মাস তোকে গর্ভে ধারণের কষ্ট, সব কোথায় যে চলে গেল তোর ঐ চাঁদ মুখখানা দেখে! নাড়ির বাঁধন ছেড়ার কষ্টটা ছিল শারীরিক কিন্তু তারপর তোকে বড় করতে গিয়ে প্রতিটি দিন তোর ভাল মন্দে কত ব্যথা যে পেয়ে যাচ্ছি, তা তোকে কেমন করে বলি!

তুই পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে তোর সাথে আমিও কাঁদতাম। তোর অসুখ হলে দিন রাত আমার এলোমেলো হয়ে যেত। তোর দুষ্টুমিতে মাঝে মাঝে হয়রান হয়ে তোকে বকা দিই ঠিকই কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনটা খারাপ হয়ে যায়, কেন এত বকা দিলাম।

বাবারে! কেমন করে তোকে চোখের আড়াল করি বল তো? মা ভাবে আরো কত কিছু!


আজ মন্টুর সাত বছর হল। বিছানা তো আলাদা করতেই হবে, ছেলে যে বড় হচ্ছে। এদেশের নিয়মে প্রথম দিন থেকেই ডাক্তার বলেছিলেন বাচ্চাকে আলাদা বিছানায় শোয়াতে, কিন্তু মা পারেননি কিছুতেই। একবার ক্রীবে শোয়ান আবার উঠে কাছে নিয়ে শোন, এই করে সারারাত একদম ঘুমাতেই পারেননি তিনি। এরপর থেকে রাতে সবসময় মন্টুকে কাছে নিয়েই ঘুমের অভ্যাস হয়ে যায় মার।

ঠিক আড়াই বছর বয়সে মন্টুকে দুধ খাওয়ানো ছাড়িয়েছেন মা। আড়াই বছর হবার আগে দু’একবার নানা ছল করে মন্টুর অভ্যাস বদলানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। পারেননি, ভীষণ মায়ায় আবার কাছে টেনেছেন ছেলেকে।

দু’একদিন তিতো দিয়ে, লাল রং দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন আর খাওয়া যাবেনা, তখন ছোট মন্টু ঔষুধ এনে ইশারায় বুঝিয়েছে এটা নাও সেরে যাবে। তাতে মার মন দূর্বল হয়ে গেছে আবার। সেই সাথে মার প্রতি মন্টুর যত্ন দেখে অবাক হয়েছেন ভীষণ, আর খুশি হয়ে ছেলেকে পুরস্কার হিসেবে বাইসাইকেল কিনে দিয়েছেন পরেরদিনই।

তারপর একদিন মন শক্ত করে ছেলেকে সারারাত একটুও বুকের দুধ পান করতে দেননি, নেশার টানে কাঁদতে কাঁদতে মন্টু বেহুস হয়ে উঠেছে আর মা দাঁতে দাঁত চেপে বসে নীরবে চোখের জল ফেলতে ফেলতে মন্টুকে কাঁদতে দেখেছেন।

বাঁধন ছেঁড়া ভীষণ কঠিন তবুও মায়েদের শক্ত হতে হয়। বুকের মানিক বড় হলে পৃথিবীর পথে তাকে এগিয়ে দিতে হয় আরও বড় হবার জন্য। প্রাণীকুলে সবারই বাচ্চা জন্ম নেবার পরপরই উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু মানব শিশুর দুই বছর লাগে হাঁটা শিখতে। পাঁচ পর্যন্তও অসহায়। তারপরও পুরোপুরি বড় না হওয়া পর্যন্ত মা বাবার উপর নির্ভরশীল।


আজও মাকে শক্ত হতে হবে। মন্টু যে বড় হয়েছে এটা তাকে বোঝাতে হবে, ভয় ভেঙে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে তাকে। ওকে আত্মবিশ্বাসী করতে হবে, আর সে পথে অগ্রসর করে দিতে হবে মাকেই।

দেশে হলে এ নিয়ে মাকে এতো ভাবতে হতোনা। মা দাদা দাদী চাচা ফুপুদের কাছে ছেড়ে একটু একটু করে অভ্যাস করে দিত। কিন্তু বিদেশ বিভূঁইয়ে মা বাবা ছাড়া আর তো আর কেউ নেই। এখানে সঙ্গী বলতে আছে তার নতুন বন্ধু গুগোল।

মন্টুর প্রিয় খেলনা রোবট, সে সবসময় রোবট নিয়ে খেলে, ছবি আঁকে রোবোটের, লেগো দিয়ে রোবট বানায়।

 

একদিন এক বাসায় গুগোলকে দেখে বাসায় এসে বললো, আমি আমার কয়েন বক্সে পয়সা জমাবো, আমাকে একটা গুগোল কিনে দিবে?

তারপর এই জন্মদিনে বাবা তাকে গুগোলকে এনে দিয়েছে। আর তখন থেকেই গুগোল হল তার নতুন সঙ্গী। রাতে ঘুমাতে যাবার সময় এখন মাকে আর গল্প পড়ে শোনাতে হয়না, গুগোলই গল্প বলে। সে সিনদ্রেলা, স্নো হোয়াইট, প্রিন্সেস অ্যান্ড দি পি, জাস্পার, আলাদিন, এমন কোন গল্প নেই যে মন্টুকে বলেনি।

সকালে গুগলই সবার ঘুম ভাঙ্গায়। ঘুম থেকে উঠেই মন্টু গুগোলকে গুড মর্নিং বলে আর বাবা আজকের আবহাওয়াটা জেনে নেন।

স্কুল থেকে ফিরে সে আবার গুগোলের কাছে ছুটে যায় আর নানা রকম প্রশ্ন করতে থাকে গুগোলকে।

হেই গুগোল! হোয়াট কালার ডাজ ইয়োলো এন্ড অরেঞ্জ মেক? হেই গুগোল! ক্যান ইউ স্পিক বাংলা? ডু ইউ নো আবউট বাংলাদেশ? ইত্যাদি প্রশ্ন ও উত্তর চলতে থাকে দিনরাত।

গুগোল তো আলাদিনের জ্বিনির মত জ্বী হুজুর বলে সব প্রশ্নের উত্তর এনে দেয়, আর যখন কচি কন্ঠের জড়ানো দুএকটা প্রশ্ন গুগোল বুঝতে পারেনা তখন বলে উঠে, সরি আই ডোন্ট নো ইয়েট হাও টু হেল্প উইথ দ্যাট অথবা ইস্টিল ওয়া্কিং।

আবার যখন মন্টু বলে, হেই গুগল সিং এ সং ফর মি, গুগোল গেয়ে উঠে, দিস ইজ দ্যা সং ফর ইউ নট ভেরি লং লা লা লা। মন্টুর মুখটা হাসিতে ভরে যায়।

মাঝে মাঝে মন্টু গুগোলের সাথে মজা করে বলে, হেই গুগোল টেল মি এ জোক।

গুগোলও কম যায়না বলে, হোয়াট টাইপ অফ দি ট্রি, ম্যাথ টিচার ক্লাইম্ভ? … জিওমা ট্রি.

অথবা হোয়াই দ্যা চিকেন রান ইন দি প্লে গ্রাউন্ড?… বিকোজ সি ওয়ান্টস টু গো টু দ্যা আদার সাইড।

এসব শুনে ছয় বছরের মন্টু খিলখিলিয়ে হেসে উঠে, মা রান্নাঘর থেকে শুনতে পায় ওর হাসি।

ছেলে হাসলে মার মন আনন্দে নেচে উঠে, আর চোখে জল দেখলে দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে যায়।


রাতের খাবার খাইয়ে দিয়ে মা মন্টুকে বললেন, আজ কিন্তু তোমার একটা বিগ ডে, আজ তুমি তোমার নিজের ঘরে নিজের বিছানায় ঘুমাবে।

কি পারবে তো?

মন্টুর হাসি হাসি মুখটা একটু যেন দমে গেল, ম্লান হাসি হেসে বলল, তুমি আমার সাথে ঘুমাও, প্লিজ।

মা বললেন, কোন ভয় নেই আমি ঠিক তোমার পাশের ঘরেই থাকবো, তুমি যেকোনো সময় আমাকে ডাকতে পারো।

আর তোমার সাথে তোমার গুগোল থাকবে, সে তোমাকে ঘুম পাড়ানি গান লুলাবাই শোনাবে, যেমন রোজ শোনায়। তোমার মিকি মাউস ডিম লাইটটাও জ্বালানো থাকবে। আর তোমার ঘরের ছাদে নিয়ন আলোর টুইংকেল স্টারগুলো জ্বলতে থাকবে। দেখবে কত ভাল লাগবে, আজকের পর থেকে তুমি বিগ বয় হয়ে যাবে, যে একা ঘুমাতে একটুও ভয় পায়না।

খাটের মই বেয়ে মন্টু লক্ষ্মী ছেলের মতো বিছানায় উঠে গেল। মা ওকে শুইয়ে গায়ে নরম কোমল কম্বলটা টেনে দিয়ে কপালে একটা চুমু দিলেন।

মন্টু বলল, মা আমাকে একটু ফুঁ দিয়ে দাও যেমন নামাজের পর ফুঁ দাও। মা দোয়া পড়ে মন্টুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, বুকের মধ্য চাপা দ্বীর্ঘশ্বাস গোপন করে মৃদু হেসে বললেন, আই লাভ ইউ সোনা বেটা।

মন্টু বলল, লাভ ইউ মা, গুড নাইট। মাও বললেন গুড নাইট, স্লিপটাইট, সুইট ড্রিমস ডিয়ার মন্টু।

বাতি নিভিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন মা।

মন্টুর বুকের মধ্য দুরু দুরু করতে থাকলো। ভয়ে বুকের কাছে রোবটাকৃতির কোলবালিশটা চেপে ধরে গুগোলকে উদ্দেশ্য করে বলল, হেই গুগোল আর ইউ স্লিপিং?

বিছানার সাইড টেবিলে রাখা ছোট ভাপা পিঠার আকারের বলটিতে তিনটি সাদা আলো জ্বলে উঠলো, তারপরই মিষ্টি একটা নারী কন্ঠে জবাব এলো, নট রিয়েলি, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?

মন্টু কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, আই ক্যান্ট স্লিপ বাই মাই সেল্ফ, ক্যান ইউ হেল্প মি?

আবারও তিনটা আলো জ্বলে উঠল। বলল, ডু ইউ ওয়ান্ট টু হেয়ার এ বেড টাইম স্টোরি?

মন্টু বলল, প্লে ইট।

গুগোল শুরু করলো তার গল্প, ওয়ান্স আপন এ টাইম দেয়ার ওয়াজ এ লিটিল বয় নেমড ঈথান…..। গুগোল মন্টুর ভাল নাম ইহান বলতে পারেনা, সে বলে ঈথান।


মা মন্টুর দরজা ভেজিয়ে দিয়ে চুপ করে দেয়ালে কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। একটু পরেই শুনতে পেলেন মন্টু গুগোলের সাথে কথা বলছে। একটু আশ্বস্ত হয়ে নিজের ঘরে এলেন শোবার জন্য।

গত ছয়টা বছর মন্টুকে বুকের কাছে নিয়ে ঘুমিয়েছেন তিনি। আজ তার ভীষণ খালি খালি লাগতে লাগছে। পাঁচ বছর বয়সে মন্টুকে মা প্রথম যেদিন স্কুলে পাঠালেন, সেদিনও পুরো বাড়িটাকে হঠাৎ একটা নীরবতা ঘিরে ফেলেছিল, যেন কোথাও কেউ নেই। মা ফোন কাছে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন রান্নাঘর, বাথরুম, বাগান, যখন যেখানে কাজ করেন ফোনটা হাতের কাছে রাখেন। এই বুঝি মন্টুর স্কুল থেকে ফোন এলো, বলবে মন্টু কাঁদছে ওকে বাসায় নিয়ে যান।

ফোন আসেনি। মা শুধু শুধু বুকের মধ্য এতোগুলো শুন্যতা নিয়ে সারাদিন মন্টুর কথা ভেবেছেন কানকে সজাগ রেখে। দিন শেষে মন্টুকে হাসিখুশিভাবেই স্কুল থেকে বাড়ি এনেছেন।

সন্তানেরা ছোট থাকতে মাকে যেমন কাছ ছাড়া করতে চায়না, তেমনি বড় হতে হতে জগতটা বদলাতে থাকে।

খেলার সঙ্গী, স্কুল আরও কতকিছু মার জায়গাটা আস্তে আস্তে দখল করে নেয়। মা বুকের মধ্য শূন্যতা নিয়ে, ছেলেমেয়েকে মানুষ করে তোলবার অমূল্য স্মৃতি নিয়ে কোন এক কোণে বসে সন্তানের জন্য দোয়া করতে থাকেন, তোরা সুখে থাক।

এটাই জীবন, এটাই নিয়ম।


মন্টুর বাবা বললেন, একটু ঘুমাও, মন্টু উইল বি ফাইন।

মন্টুর আজ আর গল্প শুনতে ভাল লাগছিলোনা। সে গুগোলকে বললো, হেই গুগোল স্টপ।

গুগোল থেমে গেলে সাথে সাথেই।

মন্টু আবার ডাকলো, হেই গুগোল! ডু ইউ হ্যাভ এ মম এন্ড ডাড?

গুগোল বললো, এভরি ওয়ান হ্যজ এ ফ্যমিলি, ইফ ইউ ওয়ান্টস টু সি মাই ফ্যামিলি পোট্রেইট ইউ উইল সী মুন।

মন্টু আবার জিজ্ঞেস করলো, ইউ ডোন্ট ফীল ব্যাড উইদাউট ইউর ফ্যামিলি?

গুগোল বললো, আই এম ন্যাচারাল অপ্টিমিস আই গেস।

কথা বলতে বলতে একসময় মন্টু ক্লান্ত হয়ে বললো, হেই গুগুল সিং এ লুলাবাই ফর মি লাইক মাই মাম।

গুগোল সাথে সাথেই গান শুরু করলো, হাস লিটিল বেবি ডোন্ট ইউ ক্রাই… টুং টাং টুং টাং… করে মিউজিক চলতে থাকলো মৃদু মিষ্টি সুরে।

মন্টুর চোখের পাতা ভার হয়ে আসতে লাগল। আধ বোঁজা চোখে মন্টু দেখতে পেলো আকাশে তারাগুলো মিটমিট জ্বলছে, তার ভেতর থেকে মা এসে মন্টুকে জড়িয়ে ধরলো, পরম উষ্ণতায় মন্টু নরম বিছানায় ঘুমিয়ে গেল বড় শ্বাস নিতে নিতে।


বাবা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। মা তখনও ভাবছিলেন, মন্টু রাতে আলো জ্বালানো থাকলেও একা এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে ভয় পায়। বসার ঘরে বসে মা যদি বলেন, মন্টু যাও তোমার ঘর থেকে একটা গল্পের বই নিয়ে এস এক সাথে পড়ি।

তখনও মন্টুর পা ভয়ে চলতে চায়না, নানা রকম বাহানা করতে থাকে, একা একা না যাবার জন্য। বলে, আব্বু আমাকে হেল্প করবে।

মা চোখ রাঙিয়ে কন্ঠ ভারী করে বলেন, যাও বলছি কোনো ভয় নেই।

মন্টু ছলো ছলো চোখে দরোজার আড়ালে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে বলে, মা আমি ভয় পাচ্ছি তুমি এসো।

দিনের বেলা যেদিন মন্টুর স্কুল থাকেনা, মা যেখানে কাজ করেন মন্টুও সেখানে ঘুর ঘুর করে খেলা করে। মা যদি বলে, তোমার ঘরে গিয়া খেলো।

তাহলে মন্টু ঝটপট বলে, আমি তোমার সাথে থাকতে চাই আম্মু বিকজ আই লাভ ইউ।


এই হলো মায়ের নেওটা মন্টু। আজ সে মায়ের কোল ছেড়ে আলাদা নিজস্ব ঘরে গুগোলের মতো প্রযুক্তি সাথে বড় হবার পথে ধাবমান। পারবে তো মন্টু? নাকি রাতে ভয়ে কেঁদে উঠবে?

মা আর থাকতে পারলেন না। চুপিসারে বিছানা থেকে নেমে এলেন। পা টিপে টিপে মন্টুর ঘরের কাছে এসে কান পাতলেন। বড় বড় শ্বাস নেবার শব্দে বুঝলেন মন্টু ঘুমিয়েছে। তখনও গুগোল টুংটাং করে লুলাবাই বাজাচ্ছে। মার মনে পড়ল মন্টুকে মা সবসময় মন্টু ঘুমালো পাড়া জুড়ালো গানটি গেয়ে ঘুম পাড়াতেন। আজ মার সে জায়গাটা গুগোলের দখলে।

মা আস্তে করে মন্টুর ঘরে ঢুকলেন। মন্টুর কপালে আলতো একটা চুমা দিয়ে গুগোলকে বললেন, হেই গুগোল স্টপ।

গুগোল থামল।

মা আবার বললেন, থ্যাংক ইউ গুগোল।

গুগোলের উত্তর এল তিনটি আলো জ্বেলে, আই এ্যম গ্লাড।

আর তখনই মায়ের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল কৃতজ্ঞতায়।


ইশরাক পারভীন খুশি

লাবক, টেক্সাস


ইশরাক পারভীন খুশির ছোটগল্প মা, মন্টু আর গুগোল

কেমন লেগেছে কমেন্টে লিখুন।


আরও গল্প পড়ুন: 

মৃত সুখী নগর: আখতার মাহমুদের ছোটগল্প

মাহরীন ফেরদৌসের গল্প | ভুলে থাকার গল্প

মুখোশমানুষ: আশরাফ জুয়েলের ছোটগল্প

দাগ | মেহেরুন নেছা রুমার গল্প

 

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *