মারুফ ইমনের উপন্যাস: যখন থামবে কোলাহল

ধারাবাহিক উপন্যাস: যখন থামবে কোলাহল | চতুর্থ কিস্তি

অভিযাত্রী ডট কমে প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হচ্ছে তরুণ লেখক মারুফ ইমনের ধারাবাহিক উপন্যাস যখন থামবে কোলাহল। আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন:

মারুফ ইমনের উপন্যাস: যখন থামবে কোলাহল

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি


যখন থামবে কোলাহল

(৪র্থ কিস্তি)


 

ট্রেন যখন আসলো তখন বেলা নয়টার বেশি বাজে। প্রথমে ভেবেছিলাম হাতঘড়ি ফেলে এসেছি, আলীরাজ সাহেবের রুমে যখন চা খাচ্ছিলাম তখন জিনাত বলল সে নাকি আমাকে ব্যাগ থেকে ঘড়ি বের করে পরতে দেখেছে। দেখলাম ওর কথাই ঠিক, পরে আবার কখন খুলে রেখেছিলাম তাও মনে নেই। বেশি উত্তেজনায় থাকলে আমার এমন হয়। তবে জিনাতের দেয়া নাস্তা আর আলীরাজ সাহেবের চা খেয়ে এখন দারুন লাগছে। শরীরে এখন যে জোর তাতে তাজিনডং পর্বতশৃঙ্গে উঠে আবার নামতে পারবো। তবে জিনাতের মা আমার ওপর যে খুশি নন তা বুঝতে পেরেছি।

ট্রেনে উঠার আগে আমি তাদের কাছে ট্রেন আসার কথা জানাতে গিয়েছিলাম, ভদ্রমহিলা শুধু বললেন, ‘আমাদের দুইটা মাত্র ব্যাগ, আমরাই উঠাতে পারবো।’

জিনাত সাথে সাথে বলল, ‘মা, অনেক ভারী ব্যাগ, এতো বই। আমরা একা পারবোনা।’

আমি একটু হেসে বললাম, ’সমস্যা নেই। আমি তুলে দেব।’

আমার হাসি দেয়াটা বোধহয় ঠিক হয়নি, মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ’তোমাকে কষ্ট করতে হবে না বাবা, আমরাই পারবো।’

ট্রেন চলে এল, যথারীতি সফুরা অনেক চেষ্টা করেও তার ব্যাগ তুলতে পারলেন না। জিনাত প্রচণ্ড রাগ নিয়ে তার মায়ের দিকে তাকালো। কয়েকবার কথা কাটাকাটিও হল, আমি তাদের মাঝে উপস্থিত হয়ে সামাল দিলাম। তবে এর চেয়েও বড় ঝামেলা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

ট্রেনের নাম ভাওয়াল এক্সপ্রেস। আসার কথা ছিল রাত বারোটায়, আসলো সকাল সাড়ে নয়টায়। অবরোধে রেললাইন সরিয়ে ফেলেছিল তাই চলাচল স্বাভাবিক হতে দেরি হয়ে গেছে। আলীরাজ সাহেব অবশ্য বলেছিলেন আরো দেরি হবে। আসার সময় কিছু বলে আসা দরকার ছিল লোকটাকে, ট্রেন লেট করলে উনার আসলে কোন দোষ নেই, তবু একটু মাথা গরম করে কয়েক কথা বলে ফেলেছি।

ট্রেনে উঠতে গিয়ে খুব বিপাকে পড়েছি। মনে হচ্ছে ঈদের ছুটিতে সবাই বাড়ি যাচ্ছে, ছাদে লোকারণ্য, আর ভেতরে পা ফেলার জায়গাটুকু নেই।  কুয়াশা সরে গিয়ে গড়ের মাঝখান দিয়ে রোদ গড়িয়ে পড়ছে আর গরম লাগতে শুরু করেছে। আমি গায়ের সোয়েটার খুলে গলায় ঝুলিয়ে বসে আছি ট্রেনের দরজায়। আমার পাশে এক বৃদ্ধ চাচা, বয়স আশির বেশি। তবে খুব রসিক মনে হচ্ছে। ট্রেন ছাড়তেই খুব আয়েশ করে পান বানিয়ে খেল দেখলাম। কই যাবেন জিজ্ঞেস করতেই একটা হাসি দিলেন, দাতগুলো লাল আর খয়েরী হয়ে আছে, অতিরিক্ত পান খাওয়ার ফল। হাসি দেখে মনে হল এই ট্রেনে উঠলে গন্তব্য ঠিক করাটা খুব জরুরী কিছু না। গামছাটা গলায় পেচিয়ে বললেন, ‘ধলা যামু, মাছের পোনা আনতে।’

জিনাত আর তার মা কোনরকম দাড়িয়ে আছে ট্রেনের টয়লেটের কাছেই। বাজে গন্ধ এড়াতে মুখে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছে তারা। একটু পর পর চানাচুরওয়ালা, ভাপা পিঠা আর লজেন্স বিক্রেতা আসছে আর যাত্রীদের ঠেলে বগির একপাশ থেকে অন্যপাশে যাচ্ছে। দেশের অবস্থা প্রতিকূল হলেও তাদের ব্যবসা মন্দ বলে মনে হল না। লোকজন ভালই চানাচুর আর ভাপা পিঠা খাচ্ছে আর রাজনৈতিক নেতাদের বকে গোষ্ঠি উদ্ধার করছে। নেতাদের কান পর্যন্ত আপামর মানুষের এই স্তুতিপাঠের কিছু অংশও যদি পৌছাতো, তবে তুলকালাম হয়ে যেত।

ট্রেনে সবচেয়ে ভাল বিক্রি হচ্ছে মুরগির সেদ্ধ ডিম। ‘ডিম, ডিম, এই ডিম’ বলে আসতেই অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়লো মনে হয়। আমিও একটা ডিম সেদ্ধ নিয়ে তাতে মরিচের গুড়ো আর লবণ লাগিয়ে খেলাম। চাচা বললেন, ’ডিম লইয়া একখান শিলুক (ধাধা) আছে। হুনবেন? মইদ্দেখানে ইট্টু পানি, চুনকাম করা ঘর। ভাইঙ্গা গড়তে বললে হের শইল্যে আসে জ্বর।’

আমি হাসলাম।

মনে পড়লো আমার মায়ের কথা। মোবাইলে এক কাঠি চার্জও নেই যে মা কে একটা কল দেব। বাড়ির বাইরে আছি অনেকদিন হয়ে গেল। মাস দুয়েক তো হবেই। এই ডিম খাওয়া নিয়ে ছোটবেলায় মার কত জোরাজুরি ছিল। এখন নেই। কথা বলতে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে এখন। কাছের মানুষকে মনে পড়ার মাঝে কোন অপরাধ নেই, বরং কাছের মানুষের সাথে কোন অপরাধ করলে আরো বেশি মনে পড়ে। মানুষ তার জীবনে অতীতকে টেনে আনতে যতবার পেছনে তাকায় ততবার বোধহয় সেই মানুষগুলোই বেশি ফিরে আসে যার সাথে সে অপরাধ করেছে কিংবা তার সাথে যে অপরাধ করেছে, এতে আসলে মানুষের হাত নেই।

জিনাতের টয়লেটে যাওয়া খুব প্রয়োজন। সে এখন যেখানে দাড়িয়ে আছে, সেখান থেকে দুই হাত দূরে টয়লেটের দরজা কিন্তু এত ভীড়, হিমালয় জয় করাও এর চেয়ে সহজ হবার কথা। তার মধ্যে একটা মেয়ে কয়েকজনকে ঠেলে টয়লেটে যাবে এটা পুরুষদের জন্য খুব মজার ব্যাপার। তারা ‘মহিলা, মহিলা’ বলে সাইড দিতে বলবে ঠিকই কিন্তু সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে গায়ে ঠেলা দিতে। লোকের ভীড়ে একটা মেয়ে কে ’স্পর্শ করা’ বা ‘ঠেলা’ দিয়ে অপ্রস্তুত করে ফেলার মাঝে অনেক পুরুষ নিজের চতুরতা আর আনন্দের উপসঙ্গ খুঁজে পায়। তবু জিনাত ঠেলেঠুলে টয়লেটের কাছে গেল, দরজায় বসে থাকতে দেখলো লোকটাকে। আশ্চর্য ! লোকটার নামই তো জানা হল না।

রেল গাড়ির টয়লেটে বেশিরভাগ আয়না থাকে না, থাকলেও ভাঙা। আর পানির ট্যাপে পানি থাকে না। অবাক করা বিষয়, এখানে দুটোই আছে। আয়না দেখাটা জিনাতের জন্য বেশি জরুরী, কেননা তার নাকফুলটা হারিয়ে গেছে। খুব সম্ভব ভীড়ের মধ্যে এ ঘটনা হয়েছে। তবে সফুরা এখনো খেয়াল করেনি, করলে জিনাতকে এই লোকের সামনেই কয়েক কথা শুনিয়ে দিতে পারে, কোন ঠিক নেই। তবে জিনাত একটা ডুপ্লিকেট বানিয়ে রেখেছিল, ইমিটিশনের। সেটা পরে আপাতত থাকলেই চালিয়ে নেয়া যাবে। টয়লেট থেকে বের হয় জিনাত একটা দারুন ব্যাপার লক্ষ করলো। লোকটা পাশের বৃদ্ধের কাধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পরেছে আর বৃদ্ধ তাকে আগলে রেখেছে যেন ট্রেন থেকে না পড়ে যায়। সকালের রোদটা তার গালে এসে পড়েছে আর একটু পরপর গাছের সারি এসে তা আড়াল করে ছায়া ফেলে আলো ছায়ার খেলা করছে। লোকটাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে ভাল লাগছে জিনাতের, তার ইচ্ছে হচ্ছে কপালে একটু ছুঁয়ে দেখার।

ট্রেন সাড়ে বারোটা নাগাদ গফরগাঁও পৌছালো। মাঝখানে এমন কোন স্টেশন নেই যে ট্রেন সেখানে দাঁড়ায়নি। পারফেক্ট লোকাল ট্রেন। নামতে গিয়ে আমার হাতঘড়িটা ছিড়ে কোথায় পড়ে গেল বুঝতে পারিনি। প্লাটফর্মে অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিল। আমি কোনরকম নেমে জানালা দিয়ে জিনাতের ব্যাগগুলো নামালাম। আমাকে যেতে হবে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে ওপারে, আমার রিসার্চ ফিল্ডে। আর জিনাত  যাবে স্টেশনের কাছেই কলেজের পাশের একটা হোস্টেলে। তাই তাদের জন্য একটা ভ্যান ঠিক করে দিলাম, কিছু না বলে একটু দূরে দাড়িয়ে রইলাম। জিনাতের মা আমার সাথে কোন কথা বললেন না, এমন যে তাদের কে এ পর্যন্ত পৌছে দেয়া তাদের হক ছিল। জিনাত মুখের ওপর থেকে বোরকার কাপড় সরিয়েছে, তার চোখে যে কাজল দেয়া তা আমি এতক্ষণ খেয়াল করিনি। কেন খেয়াল করিনি? জিনাত তার মাকে কানে কানে কি যেন বলে আমার কাছে এল।

‘আপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বাসায় যাওয়ার দাওয়াত দিলাম আর কলেজের এদিকে যদি আসেন তবে সেকেন্ড ইয়ার সমাজবিজ্ঞান জিনাত আরা বললে আশা করি পাবেন।’

আমি কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। জিনাত কিছুদূর এগিয়ে আবার কাছে এল, তার মা কিছুটা চিন্তার ভাঁজ নিয়ে তাকিয়ে আছে। সে বলল, ’আপনার নামতো জানা হল না। কিছু বলবেন?’

‘একটা ধাঁধা নিয়ে খুব ঝামেলায় পড়েছি, উত্তরটা বের করতে পারছি না।’ আমি বললাম

‘ধাঁধা? বলুন দেখি।’

‘আসলে আমার কাছে খুব নোংরা ভাষা মনে হচ্ছে, তাই বলতে চাচ্ছি না।’ শুনে জিনাত হেসে দিল, আমার নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে।

‘কোথায় শুনেছেন?’

‘ট্রেনের এক চাচার কাছে।’

‘গ্রামের লোকজন অশ্লীলভাবে এসব ধাঁধা বানায়, তবে দেখা যায় উত্তরটা খারাপ হয় না। আপনি বলুন।’

‘আচ্ছা। দুই ঠ্যাং ছড়াইয়া, মইদ্দে দিলাম ভরিয়া। আপন কাজ সারিয়া, দিলাম পরে ছাড়িয়া।’ বলেই মনে হল না বলাই উচিৎ ছিল।

জিনাত হেসে কুটিকুটি হচ্ছে, এমন কথা শুনে তার হাসি আমাকে আরো অবাক করলো।

‘আমি উত্তরটা জানিনা, তবে জেনে রাখবো। আসি।’ বলে সে ভ্যানের কাছে গেল। আমার ধারনা সে এখনো হেসেই যাচ্ছে এবং আরো অনেকক্ষণ হাসবে।


(চলবে)

 

উপন্যাসের সবগুলো পর্ব একসাথে:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!