বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, তামিম-সাকিবদের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা এবং কিছু উচ্চাশা

বিশ্ব-ক্রিকেটে ধারে এবং ভারে শ্রীলঙ্কা নামটা অনেক বড়। এবার তাঁরা এশিয়া কাপ খেলতেও এসেছিল এশিয়া কাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে কিন্তু বিদায়টা কিভাবে হয়েছে এবং তা ক্রিকেট প্রেমীদের কতটা কষ্ট দিয়েছে আমরা জানি। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ বেশ ভালো অবস্থানে ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কেমন? পরবর্তী কয়েক বছরে কোথায় পৌছাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট? 

তবে শ্রীলঙ্কার এই দুরবস্থার পোস্টমর্টেম করতে গেলে জানা যায়, তাঁরা কতটা সাঙ্গা-মাহেলা নির্ভর ছিল। দুই কিংবদন্তি প্রায় একই সময় অবসর নেওয়ায় দলটা কতটা ভঙ্গুর হয়েছে তা একটু দেখলেই বোঝা যায়।ভুল কোথায় ছিল তাঁদের? খালি চোখে দেখলে মনে হবে, যোগ্য রিপ্লেসমেন্টের অভাব কিন্তু একটু ভাল করে চিন্তা করলে দেখবেন, দোষটা শ্রীলঙ্কান বোর্ডের। কেনো?

তাঁরা খুব একটা নজর দেননি তাঁদের রিপ্লেসমেন্ট খুঁজতে আর নজর দিলেও খুব অল্প সময়ে তাঁদের তরুণদের উপর থেকে ভরসা হারিয়েছেন। গত ৩-৪ বছর ২৫ জনেরও বেশি খেলোয়াড়ের অভিষেক ঘটানো এটাই প্রমাণ করে। তাঁরা কাউকে দলে থিতু হতে দেননি। সম্ভাবনাময় হলেও বোর্ডের তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার লোভ তাঁদের বেশি দিন দলে থাকতে দেয়নি।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, তামিম-সাকিবদের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ 

এবার আসি বাংলাদেশ ক্রিকেটে। আপনি, আমি সবাই জানি বাংলাদেশ নামক দলটা পাঁচটা খেলোয়াড়ের উপর অতি নির্ভর হয়ে আছে। অতি নির্ভর বলব কারণ সাম্প্রতিক রেকর্ডে এশিয়া কাপ কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি-২০ সিরিজ বাদ দিলে সব ম্যাচ বাংলাদেশ পঞ্চ-পান্ডবের উপর ভর করে জিতেছে। এজন্যই ভয়টা কি আমাদের বেশি হওয়ার কথা না?

চিন্তা করেন, যদি এই পাঁচ জনের অবসরের পর আমাদের কি হবে, ভয়টা কি খুব অমূলক?

শ্রীলঙ্কান বোর্ড সাঙ্গা-মাহেলার রিপ্লেসমেন্ট খুজতে এতই মরিয়া ছিল যে, কোনো বাহাতি ব্যাটসম্যান দলে আসলেই শ্রীলঙ্কান মিডিয়া সেই ছেলেকে “নতুন সাঙ্গাকারা” উপাধি দিত।  পরবর্তীতে একটু খারাপ করলেই দলকে বাদ পড়তে হতো। অথচ এটা চিন্তা করা হয় নি যে, আমরা আর সাঙ্গাকারা পাবো না তাহলে কেনো নতুন ছেলেকে এত বড় দায়িত্ব দিচ্ছি।

এই “নতুন সাঙ্গাকারা” উপাধির সবচেয়ে বাজে শিকার হয়েছিলেন লাহিরু থিরিমান্নে। তিনি যখন দলে এসেছিলেন সম্ভাবনাময় হয়েই এসেছিলেন, কিন্তু হয়তো “সাঙ্গাকারা” হওয়ার চাপটা নিতে পারেন নাই। ফলে, শ্রীলঙ্কা হারালো একজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়, যাকে “লাহিরু থিরিমান্নে” হতে বললে হয়তো সফল হতো।

বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডও কি একই কাজ করবে? কোনো নতুন পেস বোলার আসলেই কি তাঁকে বলা হবে “নতুন মাশরাফি”? কিংবা মিরাজ এর অল-রাউন্ড পারফরম্যান্স দেখে কি বলবেন সে “নেক্সট সাকিব”। এই নামের ভারগুলো নিতে পারবে তরুণরা?

বাংলাদেশের এই তরুণ ক্রিকেটারদের টেকনিক্যাল এবং টেম্পারমেন্টের দিকটা ঠিক করলে এরা দলকে অনেক কিছু দিবে। হয়তো বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপটাও 

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল? ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই আশাবাদী একজন মানুষ। আমার কাছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বর্তমানে যে তরূণরা আছে, তাঁরা জ্বলে উঠতে পারলে তাঁদের প্রাপ্তি আরো বেশি হবে। কিভাবে? চলুন একটু গভীরভাবে  আলোচনা করি।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে আমার কাছে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের নাম বলতে বললে আমি মিরাজ, লিটন, মোসাদ্দেক, আরিফুল, মিথুন, অপু, মুস্তাফিজ, রনি, আবু জায়েদ, শান্ত,সাইফুদ্দিন, সৌম্য, সাব্বির এবং  তাসকিনের নাম বলব। শেষ তিন জনের নাম শুনে কি একটু খটকা লাগছে?

তাঁরা দলে প্রচুর সুযোগ পেয়েছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। এরপরেও তাঁরা যদি নিজের ঘাটতির জায়গায় কাজ করে দলে ফিরতে পারে, তাহলে আমি তাঁদের উপর বাজি রাখতে রাজি।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, তামিম-সাকিবদের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ

প্রথমেই “ব্যাড বয়” সাব্বিরকে নিয়ে একটু কথা বলি। সাব্বির দলে ঢুকেছিলেন একজন হার্ড-হিটার হিসেবে। অসাধারণ ফিল্ডার, দলে এসে কিছু রান করেছিলেন যা দলে তাঁর জায়গা পাকা করে দেয়। কিন্তু গত দুই বছরে তাঁর বাজে ফর্ম যে বাংলাদেশকে কতটা ভুগিয়েছে, তা না বললেও বুঝবেন। তার উপর আবার মাঠের বাইরের লাগামছাড়া জীবন-যাপন। দলে এসেই একটা সোজা রাস্তা পেয়েছিলেন, যে কারণে নিজের দুর্বলতা নিয়ে আর কাজ করেননি। ফলে ফর্ম পড়ে যাওয়াটা তো স্বাভাবিকই ছিলো। সাব্বির  যদি নিজের উপর কাজ করে ফিরে আসতে পারে তাহলে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের একজনকে পাবে।

সৌম্যর শুরু কতটা অসাধারণ ছিল। ফিফটি-সেঞ্চুরিতে সাজানো প্রথম দিকের এক মৌসুম। তারপর? দুর্বলতা যেনো একটার পর একটা বের হতে লাগল। পেস বোলিং এর সামনে বিন্দুমাত্র ফুট-ওয়ার্ক করেন না। উপমহাদেশের ব্যাটসম্যান হয়েও স্পিন বোলিং খেলতে পারেন না। ফুট-ওয়ার্ক নাই বললেই চলে। এগুলো নিয়ে কি কাজ করেছেন সৌম্য? সর্বশেষ এশিয়া কাপে তো একই ভুলগুলোই দেখলাম।

তবে সৌম্যর ব্যাটিং ঘষা-মাজা করলে দলের জন্য হতে পারেন সম্পদ। পার্ট-টাইম পেস বোলিং অপশন হিসেবেও তাঁকে দলে জায়গা দিতে হবে যদি ব্যাটিংটা একটু ঠিক করে আসেন। তাসকিন আহমেদ তো আরেকটি ধুমকেতুর নাম বলতে গেলে। কি অসাধারণ পেস, অসাধারণ লাইন-লেংথ। কই গেলেন সেই তাসকিন? অ্যাকশন শুধরানোর পর আর সেই রুপে তাঁকে দেখা গেলো না।

তাঁকে নিয়েও কিছু দুর্নাম আছে ক্রিকেট মহলে। অনুশীলন থেকে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম নাকি তাঁকে বেশি টানে। এরা কি ধুমকেতু হয়ে রইবেন নাকি ফিরে এসে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন তা সময়ই বলতে পারবে।

পেস বোলিং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে আমি একটু বেশি আশাবাদী হই কারণ আমাদের কাছে প্রতিভাবান কিছু পেস বোলার দলে ঢোকার অপেক্ষায় আছে। আবু জায়েদ এবং আবু হায়দার দলে নিয়মিত জায়গা না পেলেও যতবারই সুযোগ পেয়েছেন, নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বিশেষ করে বলতে গেলে, আবু হায়দার রনির নামটা যে বলতেই হয়।

ক্রিকেট বিশ্বে অন্যতম পরাশক্তি হয়ে উঠছে বাংলাদেশ | পড়তে ক্লিক করুন

যতবারই সুযোগ পেয়েছেন, নিজের জায়গায় ধরে রাখার দাবি জানিয়েছেন। যদিও স্লগে বোলিংয়ে আসলে তিনি মার খান তবে শুরুর দিকে নতুন বলে সুইং করানোর প্রতিভা এই জায়গায় রনিকে অনন্য করেছে। তার উপর মুস্তাফিজ ফিট থাকলে যেকোনো দলের প্রতি হুমকিস্বরূপ। আগে শুধু কাটার তার উইকেট টেকিং ডেলিভারি ছিল কিন্তু তার তূণে এখন বাউন্সার, আউটসুইং এর মতো ডেলিভারিও যোগ হয়েছে।

স্পিন বোলিং নিয়ে কথা বলতে গেলে মিরাজ-অপুর নামই সবার আগে আসবে। মিরাজ যেমন ফিল্ডার হিসেবে অসাধারণ, তেমনি বোলার হিসেবেও অত্যন্ত চতুর।ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস ট্র্যাকে মিরাজের সফলতা প্রমাণ করে, এই ছেলেটা এত কম বয়সেও বল হাতে কতটা পরিণত। একজন মেহেদী মিরাজ এর মতো তরুণই আমাদের আগামীর অধিনায়ক তা একটু মনোযোগ দিলেই বুঝতে পারবেন।

ইতিবাচক মনোভাব এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতা এই ছেলেকে অন্য দশটা তরুণ থেকে আলাদা করেছে। প্রমাণ দেখতে চান? ফাইনালে ১২০ রানের পার্টনারশিপ এবং পাকিস্তানের সাথে স্পেলটা দেখেন। এ তো মিরাজের কথা, আরেকজন সম্ভাবনাময় বোলার হলো নাজমুল ইসলাম অপু। অপু বিপিএল এর মাধ্যমে নজর কাড়েন। রানের চাকা থামাতে পারেন ভালো। বোলিং এর লাইন-লেংথও ভালো। বাজে বল কম করেন। অপুকে নিয়ে আশা করাই যায়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, তামিম-সাকিবদের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ
Liton Das

এবার আসি ব্যাটসম্যানদের গল্পে। এই মুহূর্তে তরুণ ব্যাটসম্যানদের যাকে নিয়ে বাজি ধরা যায়, তার নাম লিটন কুমার দাস। এই খেলোয়াড়ের জন্য শুরুর দিকের ব্যর্থতা শাপে-বর হয়ে এসেছে। দলে টেকার জন্য লড়াই করেছেন, দল থেকে বাদ পড়েছেন এবং ঘরোয়াতে আবার রান করেছেন। যে কারণে নির্বাচকরা তাঁকে ডাকতে বাধ্য হয়েছেন।

হয়তো তার আরো কাজ করা বাকি কিন্তু যে পিচ্ছিল এবং কঠিন পথ তিনি পার হয়ে এসেছেন, আমার মনে হয় না তাঁর আর পা ফসকাবে। লক্ষ্য বড় হলে সফল হবেন অবশ্যই।

মোসাদ্দেকের পারিবারিক জীবনের চাপ তাঁর ক্যারিয়ারে বাজে প্রভাব ফেলেছে। শুরু সুন্দর হলেও গত কিছুদিন ধরে তাঁর পারফরম্যান্স খুবই বাজে। সেদিক দিয়ে মিথুন কিন্তু ঠিক পাস করেছেন। শুরুর ব্যর্থতাকে রুপ দিয়েছেন সফলতায়। দুইটা বড় পার্টনারশিপে বাচিয়েছেন ম্যাচগুলো।যদিও আউটগুলো প্রমাণ করে কাজ করা বাকি অনেক।

গ্রামের দুরন্ত এক কিশোরের মাশরাফি বিন মর্তুজা হয়ে উঠার গল্প | পড়তে ক্লিক করুন  

বাংলাদেশের এই তরুণ ক্রিকেটারদের টেকনিক্যাল এবং টেম্পারমেন্টের দিকটা ঠিক করলে এরা দলকে অনেক কিছু দিবে। হয়তো বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপটাও। কিন্তু দরকার প্রপার নার্সিং। এই খেলোয়াড়গুলোকে ঠিকমতো গড়ে না তুললে এদের অবস্থা শ্রীলঙ্কানদের মতোই হবে।  

আমাদের দর্শকেরও কিছু দায়িত্ব আছে। এরা খারাপ করলে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমেই সমালোচনা করা উচিত। গালি দিয়ে নয়। এদের উপর আমরা “নেক্সট সাকিব” কিংবা “নেক্সট তামিম” ট্যাগ না লাগাই। এদের বাংলাদেশের প্রথম “লিটন দাস” কিংবা “মেহেদী হাসান মিরাজ” হতে উৎসাহিত করি। তবেই পাবো, বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেকটি স্বর্ণযুগ।

Share this

1 thought on “বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা এবং কিছু উচ্চাশা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *