ছোটগল্প: আলমগীর মাসুদ

ছোটগল্প: নতুন চারার স্বপ্নে একটি করুণ রাত | আলমগীর মাসুদ

আলমগীর মাসুদের ছোটগল্প: নতুন চারার স্বপ্নে একটি করুণ রাত

 

| নতুন চারার স্বপ্নে একটি করুণ রাত |

আলমগীর মাসুদ


 

তজবির বদলে সিগারেট, নামাজের বদলে গান শোনা বেশ অভ্যাসে পরিনত হয়েছে হানিফ সাহেবের। সকালবেলা গোল্ডলিফের ধোঁয়া ফেলে রবীন্দ্রসংগীত শোনেন আরাম কেদারায় বসে। সাইকেলের শব্দ হলে বারান্দায় যান হানিফ সাহেব। না, নজরুল নয়- পথচারীরা সাইকেল হাঁকিয়ে বাজারে যাচ্ছে। কেউ যাচ্ছে চাকরিতে আর ছেলেমেয়েরা প্রাইভেটে। সকালবেলায় এই রাস্তাটায় একটু বেশিই শোরগোল থাকে। নোয়াপুর, কামার গ্রাম, দক্ষিণটিলাসহ শালধরের মানুষগুলোকে এই রাস্তাদিয়েই যেতে হয় সমিরহাট বাজারে। নজরুলও সাইকেল চালিয়ে ঠিক এই সময় পত্রিকা দিয়ে যায় প্রতিদিন। তাকে মাসে তিনদিন কি চারদিনের বেশি দেখে না হানিফ সাহেব। মাসের এক তারিখ হলে সংবাদ-পত্র বিক্রয় কেন্দ্রের কেশমেমোটি রেখে যায় সে পত্রিকার ভেতর। ছ-সাতদিন পর এসে পুরো মাসের বিল নিয়ে যাওয়ার সময় মাঝে মধ্যে দুই একদিন দেখা হয় তার সাথে। এছাড়া বাকি দিনগুলোতে নজরুলের ছায়াও দেখা যায় না বললেই চলে।

পত্রিকায় চোখ রাখেন হানিফ সাহেব। ড্রয়ার থেকে দেয়াশলাই আর সিগারেটের প্যাকেটটা বের করেন। প্লেয়ারে বেজে উঠে শিল্পী নবনীতা দেবসেনের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত। মুখ থেকে সিগারেটের ধোঁয়া বের হয় না। অর্ধেকটা ফেলে বাকিটা যেন ভেতরেই আটকে রাখেন। কাঁধ ঘুরিয়ে আঙুলে ছাপ দিলে গান থেমে যায় ততক্ষণে। হানিফ সাহেব দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার চার কলামের শিরোনামটি পড়েন- কভার্ডভ্যানের ধাক্কায় একটি লেগুনা খাদে পড়ে-আঠারো বছরের ছেলেসহ তিনজন নিহত! রাজধানীর মতো এখন গ্রাম, মফস্বল শহরের সাংবাদিকরাও আজকাল সমান সংবাদের কাজ করে চলে। যেকোনো সংবাদের উপস্থিতিতে তাদের হাতদিয়ে ঘটনার ছবিও উঠে আসে দ্রুত। শিরোনামের নিচে তিনজন নিহতের ছবি ছাপা হয়েছে। চোখ দুটি বড় করে, চমকে দেখেন হানিফ সাহেব। মহিলা দুটি নয়, বারবার নিহত ছেলেটির মুখের দিকে তাকান। যেন কিছুটা ঝাপসা দেখেন- আবার তাকান। পত্রিকাটি শক্ত হাতে ধরে রাখেন। কেবল ছবিটির দিকে তাকান তিনি। বারবার তাকান। মাথা নিচু করে তাকান। এবার শিওর হন হানিফ সাহেব…

 

দুই

 

উপভোগ করার কিছু নেই। তার পায়ের চিহ্ন এখনো যায়নি। শব্দও হয়েছে কাল দ্বিগুণ। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে বের হলে আর ফেরেনি ঘরে। ছেলের উত্তেজনা নিয়ে হানিফ মোহাম্মদ কারো কাছে নালিশ বা অভিযোগ করেনি। বরং নিজেকে মুহূর্তে দুর্ভাগ্য মনে হয়েছে। হানিফ মোহাম্মদ চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন মাত্র তিনমাস। এরই মধ্যে অবসরের সময় যে টাকা পেয়েছেন তা এখনো উত্তলন করেননি। তবে অফিসের নিয়ম টাকার হিসেবনিকেশ সবসময় চেকের মাধ্যমে করা হয়। হানিফ সাহেবের বেলাও একই নিয়ম। একাউন্ট অফিসার আঠারো লক্ষ টাকার চেক তার হাতে তুলে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা কর্মচারির উপস্থিতিতে তাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় দেয়।

ছোটগল্প: জোয়ার-ভাটা পড়ুন

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের, সমাজসেবা অফিসার হিসেবে শুরুতেই কর্মরত ছিলেন হানিফ মোহাম্মদ। চাকরি জীবনে তার মূল্যায়ন কম হয়নি। কিন্তু বাধসাধে সংসার জীবনে। এক ছেলে আর স্ত্রী। দুইমাস হলো স্ত্রী চলে গেছে। বিষয় ঝগড়ার কারণ। ছেলেটাও আজ না বলে চলে গেছে ঘরের বাহির। একতলা বাংলোবাড়িটার উঠানে বসে রাজ্যের চিন্তা আর নিঃসঙ্গতা যেন তাকে একা করে তোলে। হানিফ সাহেব সবসময় স্বাভাবিক আচরণ করতেন স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে। হাসিমুখে কথা বলতেন বাড়ির প্রতিবেশীদের সাথেও, অফিসে চুপচাপ গম্ভীর থাকলেও বাড়ি এলে কাউকে বুঝতে দিতেন না- এমন স্বভাবের তিনি। বিশেষ করে স্ত্রীকে।

হানিফ মোহাম্মদ চিন্তিত চেহারায় চুপচাপ বসে থাকেন। নেহারি ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে দাঁড়ায়। প্রশ্ন করে নেহারি- কি রান্না করবে। ‘সবজি আর মাছ রান্না করে তুমি চলে যাও। কাল সকাল সকাল এসে, নাস্তা তৈরি করে যেও।’
নেহারি’র উপর হানিফ সাহেবের আজকাল যা ভরসা। বাড়িটাতে সে একা থাকলেও দিনের মাঝে নেহারি আসলে মনে হয় না, বাড়িটা মানুষ শূন্য। এই বাড়িতে নেহারি’র কাজের বয়স তিন বছরের বেশি হচ্ছে। স্ত্রী’র কাজে সহযোগিতা করতে মূলত তাকে এ বাড়িতে রাখা হয়।

দেলু ফকিরের মেয়ে নেহারি আক্তার। বাবার সঙ্গে সে ছোট বয়স থেকে হেঁটে হেঁটে ছাতা, পুরানা ডেক্সি মেরামতের কাজ করলেও মাঝ বয়সে একটি শুঁটকির দোকানও দিয়েছিলো নিজ এলাকায়। কিন্তু আর যাই করুক- অন্তত ঋণ নিয়ে তো আর ব্যবসা চালানো যায় না। তাই ঋণের বোঝায় সব ছেড়ে বর্তমানে একচালা ঘরটিতে বসে আল্লা আল্লা করে দিনপার করছে দেলু ফকির। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার যোগীপল গ্রাম থেকে আসা বজল বদের সঙ্গে নেহারি’র বিয়ে হয়। বজল দীর্ঘদিন এই গ্রামে কাজ করার সুবাদে নেহারিকে বিয়ে করতে সহজ হয়েছে। তা না হলে দূর থেকে আসা অচেনা এক বদলার হাতে কার মেয়েকেই বা তুলে দিবে। বাড়তি চিন্তার দিকে না গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে দেলু ফকির মেয়েকে বজল বদলার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়। কি আর করবে সে, মেয়ের তো বয়স বাড়ছে- তার উপর যৌতুক ছাড়া কে নিতো তাকে?

 

তিন

 

সিগারেটের গোড়াটা অ্যাশট্রেতে না রেখে মাটিতে ছুড়ে মারেন। দরজাটা খোলা- দেখে নেন একবার। ছেলে চলে যাবার পরও দরজা বন্ধ করেননি। হাসিব বারবার বলছিলো- আব্বু, আম্মুকে তুমি ফিরিয়ে আনো। না হয় আমি নানুর বাড়ি চলে যাবো। আমি আম্মুর কাছে থেকে যাবো। বাড়িতে আর আসবো না কখনো। আম্মুকে ছাড়া আমি থাকবো না। হানিফ মোহাম্মদ ছেলের স্পষ্ট কান্না শুনতে পান। নিজের ভেতর জেদটা নিজের সঙ্গেই যেন যুদ্ধ করে চলে। মুহূর্তটা সম্পূর্ণ বেমানান লাগছে তার। একটি মাত্র ছেলে, অথচ আজ ছেলের কথাও রাখতে পারছেন না! আবার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনবেন তাও সম্ভব নয়। কেবল চিন্তাটা হঠাৎ বেড়ে গেছে হাসিবের জন্য।

ছোটগল্প | প্রেমগুলো নদী হয়ে যায় পড়ুন

নেহারির কাজ এখনো শেষ হয়নি। তার রান্না করতে একটু বেশিই সময় লাগে। হানিফ সাহেব আবার বাজারি মসলাও খান না। প্রতিদিন বাটায় নেহারিকে মসলা পিষতে হয়। তাই দেরি হলেও নেহারিকে কিছু বলেন না। কারণ সবকিছু টাটকা পাওয়া যায়। অবশ্যই তার হাতের রান্নাটাও খারাপ নয়। সংবাদটি বিস্তারিত পড়া হলে- হাসিবের চেহারা ভেসে উঠে। গতকাল ছেলে কি পরেছিলো তা কল্পনা করেন। শেষ কথাটি কি বলেছিলো তাও ভাবছেন। ততক্ষণে তার চোখের কোনে জল এসে জমা হয়।

 

চার

 

রোদের কোনো লক্ষণ নেই। মেঘঘেঁষা আকাশ। উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকান একবার। কাল রাতে ভালো ঘুম হয়েছে। গত ক’মাস টেনশন করতে করতে অনেক কিছুই তার অগোছালো ছিলো। আজ দিনটা মেঘলা হলেও- হানিফ সাহেবের মুখটা বেশ হাসিময়। সুন্দর রঙের মানুষগুলোর মুখে যতবেশি হাসি হাসি ভাব থাকবে- তাকে ততবেশি ভালো লাগবে। জানালা খোলার শব্দ হলে ফিরে তাকান হানিফ মোহাম্মদ। মনে হলো, এই জানালায় কতদিন পর কারো হাত লেগেছে। আকাশটা মুহূর্তে পরিস্কার হয়ে উঠলো। মনে হলো, মেঘের সঙ্গে যুদ্ধে জিতে সূর্যটা তেজে উঠছে পশ্চিমে, আর সে সূর্যের আলোয় স্ত্রীর চেহারাটা দেখছেন বারবার। কিছুদিন আগে ছেলের মৃত্যুর সংবাদে ছুটে এসেছেন স্ত্রী। স্বামীর শুকিয়ে যাওয়া চেহারাটা অনেকদিন দেখা হয়নি সেভাবে, তাই খানিকটা করুণ চোখেই তাকান তার দিকে। মুহূর্তেই হৃদমায়ায় ভুলে যায় পুরোনো সব মানঅভিমান। দিনশেষে তারা ভুলে যায় সদ্য প্রয়াত ছেলের কথাও! কারণ পৃথিবীর সত্য সংসারের জলঘ্রাণ এমনি।

সন্ধ্যার পর পাখিদের রাতে নতুন চাষের স্বপ্নে পুনরায় দুজনে বিভোর। চুম্বনের আওয়াজও হয় না। চারঠোঁটে ফিসফিস শব্দ, জন্ম দিবে আরেকটি সন্তান। চার হাতের যুদ্ধে দুজনে আদিম আগুনে শামিল হয়। দিনের শোক- রাতে আর টেনে আনে না। স্বপ্ন দেখে হানিফ সাহেব, আবার একটি নতুন চারার।

 

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *