ফুটবলার লুইজ সুয়ারেজের সফলতার গল্প

যুদ্ধে জয়ী লুইজ সুয়ারেজ, নারীই যার সফলতার রহস্য

আমেরিকান কৌতুক অভিনেতা গ্রোউচো মার্ক্স-এর খুব বিখ্যাত একটা উক্তি রয়েছে সেটি হলো – “প্রতিটি সফল মানুষের সাফল্যের পেছনে একজন নারীর অবদান থাকে এবং এই নারীটি হলো তার স্ত্রী”

একটি সত্যিকার গল্প দিয়ে উক্তিটির প্রমাণ দিচ্ছি ছেলেটার বয়স তখন ১৫ বছর সাত ভাই-বোনসহ নয়জনের সংসার তার বাবা উপার্জন দিয়ে পুরো পরিবার চালাতে পারতেন না। অনেকদিন না খেয়ে থাকার ঘটনাও ঘটত। বিভিন্ন ধরণের নিম্ন পর্যায়ের কাজও তাকে করতে হতো। এর সাথে যুক্ত হয় অসৎ সঙ্গ। তাদের সাথে মিশে বিভিন্ন নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে সে

একটি মেয়ে এবং লুইজ সুয়ারেজ 

এমন সময় তার পরিচয় হয় একটি মেয়ের সাথে মেয়েটি আবিষ্কার করলো ছেলেটির ফুটবলের দিকে অসামান্য প্রতিভা আছে সে ছেলেটিকে অনুপ্রেরণা দিতে থাকলো সাথে নেশাময় জীবন থেকেও বের করে আনলো সাকসেসের আসলে অর্থ বুঝাতে সক্ষম হলো ছেলেটিকে ছেলেটাও তার প্যাশনের দিকে ছোটা শুরু করল ঠিক সাত বছর প্রেমের পরে তাদের বিয়ে হয়।

ছেলেটি এখন মস্ত বড় একজন ফুটবলার। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে বেশি হ্যাট্রিক তার। এছাড়াও উরুগুয়ের প্লেয়ারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল তিনি।

যে মেয়েটির কথা বলছিলাম তার নাম “সোফিয়া ব্যালবি”। ধারণা করতে পারছেন ছেলেটির নাম? ছেলেটির নাম হলো – লুইস সুয়ারেজ

 

ফুটবলার লুইজ সুয়ারেজের সফলতার গল্প

 

লুইজ সুয়ারেজ, পুরো নাম লুইস আলবার্তো সুয়ারেজ ডায়েজ। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৭ সালের ২৪ই জানুয়ারী উরুগুয়ের সালতো শহরে। বাবা রোদোলফ খুবই গরীব ছিলেন। রোদোলফের পূর্ব পুরুষ ছিলেন আফ্রিকান। সুয়ারেজের পুরো পরিবার মন্টেভিডিওতে স্থানান্তরিত হয় তার সাত বছর বয়সে। সুয়ারেজ “এল পিস্তারিত” নামেও পরিচিত। এছাড়াও “চেও”, “মেমে”, “এল সালটা” হিসেবেও তিনি পরিচিত।

ফুটবলে লুইজ সুয়ারেজ 

সাত ভাইয়ের মধ্যে তার বড় ভাই, পাওলো সুয়ারেজ ছিলেন একজন পেশাদার ফুটবলার। পাওলো গোয়েতেমালার পেশাদারী লিগে খেলতেন। মূলত এখান থেকে ফুটবলের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। তবে একটি প্রফোশনাল ফুটবল কোচিং করা তো দূরে থাক, একটি বুট কেনার সামর্থ্যও ছিলো না তার। তাই এলাকার রাস্তাতেই চলত তার অনুশীলন।

অন্যদিকে শুধু সোফিয়া নয়, তার মা সান্দ্রা সুয়ারেজ নিজেও যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দেন। মাত্র সাত বছর বয়সে মন্টেভিডিওর উয়েটা ফুটবল টিমে নিয়ে যান। এখানে গিয়েই ফুটবলকে মনে প্রাণে ভালোবেসে ফেলেন। এমনকি স্কুলে না যাওয়া নিয়ে তার কোন আক্ষেপ ছিল না। কারণ স্বপ্নটা ফুটবলার হবার।

কথা কাটাকাটির একটা সময় মিডফিল্ডার ওটম্যান ব্যাকেলকে কামড় দিয়ে সাত ম্যাচ নিষিদ্ধ হন লুইজ 

উয়েটা ফুটবল টিমের হয়ে একটি প্রীতি ম্যাচে তিনি পরিবর্তিত খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে নেমে হ্যাটট্রিক করেন। এটি ছিলো তার জীবনের প্রথম হ্যাট্রিক। তিনি এই অর্জন তার আদর্শ এনজো ফ্রান্সেসকলি ও গ্যাব্রিয়াল বাতিস্তিতাকে উৎসর্গ করেন।

উয়েটাতে খেলতে খেলতে নয় বছর বয়সে তিনি উইলসন পিরেজের নজরে আসেন। পিরেজ ন্যাসিওনাল যুব টিমের স্কাউটিংয়ের কাজ করতেন। কিন্তু ঠিক তখনই ন্যাসিওনাল টিমে জায়গা করে হয়ে উঠে নি তার। এরই মধ্যে ১২ বছর বয়সে তার বাবা মারা যান। সেই সময়ে তার মা এবং দাদী পরিবার চালানোর জন্যে যথেষ্ট পরিমাণে চেষ্টা চালিয়ে যান।

এসময়ে সুয়ারেজের জন্যে আসে সবচেয়ে বড় সুসংবাদ। তিনি ন্যাসিওনালের হয়ে ক্যারিয়ারের খাতা খোলেন। এসময় তিনি ফুটবল থেকে টুকটাক উপার্জন শুরু করেন। সে উপার্জন দিয়ে পরিবারের চাহিদা অনেকখানি পূরণও হয়ে যেত।

ঠিক এ ঘটনাটি তাকে খেলার দিকের ঝোঁক আরো বারিয়ে দেয়। এভাবে ন্যাসিওনালের হয়ে খেলতে খেলতে ১৫ বছর বয়সে তিনি সোফিয়া ব্যালবির সাথে প্রণয়ে জড়ান।

 

ফুটবলার লুইজ সুয়ারেজের সফলতার গল্প

 

সোফিয়া সাথে লুইজের দাম্পত্য জীবন 

২০০৯ সালে তারা বিয়ে করেন। লুইজ-সোফিয়া দম্পতির ঘরে একজন পুত্র সন্তান ও একজন কন্যা সন্তান রয়েছে। পুত্র সন্তানের নাম বেনজামিন আর কন্যা সন্তানের নাম ডেলফিনা। পরিবারের ব্যাপারে লুইস যথেষ্ট সচেতন। পরিবারকে কাছাকাছি রাখতেই তিনি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

২০০৫ সালের মে মাসে তার ক্লাব অভিষেক হয়। তবে প্রথম গোল পান সেপ্টেম্বর মাসে। সব মিলিয়ে ন্যাসিওনালের হয়ে ১২ ম্যাচে ৩৪টি গোল করেন। তিনি ন্যাসিওনালকে ২০০৫-০৬ এ উরুগুয়ান লীগ জিততে প্রধান স্ট্রাইকার হিসেবে ভূমিকা রাখেন। কিক, ওভারহেডের মত জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে সেবছরই তিনি সবার নজর কাড়েন।

আর এর স্বীকৃতিও পেয়ে যান খুব কম সময়ের মধ্যেই। ২০০৭ সালে উরুগুয়েন টিমের হয়ে অনুর্দ্ধ-২০ খেলতে কানাডা যান। যদিও উরুগুয়ে স্ব-মহিমায় জ্বলে উঠতে পারেনি। কিন্তু সুয়ারেজ নিজের সার্মথ্যের জানান খুব ভাল করেই দিয়েছিলেন সেই আসরে। এই আসরের প্রথম ম্যাচেই ৮৬ মিনিটে দুইটি হলুদ কার্ডের রেকর্ড করে ফেলেন। এই টুর্নামেন্টে তিনি ৪ ম্যাচে ২টি গোল করেন।

চিলিনিকে কামড়ানোর অপরাধে নয়টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্যে নিষিদ্ধ হন তিনি। কামড়ানোর এই স্বভাব সম্পর্কে সুয়ারেজ ছোটবেলা খাবার চেয়ে খাওয়ার ঘটনাকে দায়ী করেন।

গোল নয়, নিজের জাত চেনাতে পেরেছিলেন সুয়ারেজ। এর কারণেই তিনি অ্যাজ্যাক্স ও গ্রোনিঙ্গেন থেকে পেশাদারী ফুটবল খেলার জন্যে প্রস্তাব পেতে থাকেন। এই দুই ক্লাবের দর কষাকষিতে অ্যাজাক্স সুয়ারেজকে দলে নেন ৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে।

ক্লাবে সুয়ারেজ 

অ্যাজাক্সের সাথে পাঁচ বছর চুক্তির সময়ে তিনি ১১১ ম্যাচে ১৫৯ গোল করেন। পাশাপাশি, অ্যাজাক্সের সাথে প্রথম সিজনেই তিনি ডাচ ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার পুরষ্কার জেতেন।

এরপর সুয়ারেজের গন্তব্য হয় ইংলিশ ক্লাব লিভারপুল। ২২.৮ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে তাকে কিনে নেয় এই প্রসিদ্ধ ক্লাবটি। ২০১১ সালের এই ঘটনা তাকে সে সময়ের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায়। নিজ নৈপুণ্যে দলকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়ে দেন।

সাথে সাথে গোল্ডেন বুটকেও নিজের করে নেন এই উরুগুয়েন স্ট্রাইকার। সে বছরই তিনি প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার এবং ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার নির্বাচিত হন। তিনিই প্রথম নন-ইউরোপিয়ান হিসেবে এই সম্মাননা পান।

 

 ফুটবলার লুইজ সুয়ারেজের সফলতার গল্প

 

লিভারপুলে লুইজ সুয়ারেজ 

লিভারপুল ছিলো সুয়ারেজের ফুটবল ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কিন্তু পরিবার ঘেষা সুয়ারেজ বেশিদিন লিভারপুলে ছিলেন না। কারণ তিনি তার সন্তান আর স্ত্রীর আরো কাছাকাছি থাকতে চাচ্ছিলেন। তবে লিভারপুল নিয়ে তার আবেগের অন্ত ছিলো না। তিনি তার মেয়ের নাম ডেলফিনা রাখেন লিভারপুলের স্টেডিয়াম অ্যানাফিল্ডের আদলে।

মূলত এই স্টেডিয়ামেই তিনি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ভালো সময়গুলো কাটিয়েছেন। এমনকি, লিভারপুল ছেড়ে যাবার অনেক পরে তিনি ডেলফিনাকে লিভারপুলের জার্সি পড়িয়ে ইন্সটারগ্রামে ছবি আপলোড করেন। যা তার লিভারপুলপ্রীতির জোরালো প্রমাণ দেয়।

লিভারপুল থেকে এই তারকা খেলোয়াড় ২০১৪-১৫ সিজনে বার্সায় খেলা শুরু করেন। ৯ নম্বর জার্সি পরিহিত এই প্রতিভাকে দলে নিতে এই স্প্যানিশ ক্লাবটির খরচ করতে হয়েছে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। নেইমার-মেসি-সুয়ারেজ ত্রয়ী যেন অন্য মাত্রা যোগ করতে লাগলেন শতবর্ষ পুরোনো এই ক্লাবের জয়রথিতে। লা লিগা, কোপা দেল রে, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ টানা জিতে বার্সার সুসময়ের সাক্ষী হলেন সুয়ারেজ।

ক্লাবের হয়ে প্রতি ১৮ ম্যাচে গড়ে ১টি হ্যাট্রিক যেন সুয়ারেজের স্বভাবজাত গুণ হয়ে গিয়েছিলো। প্রিমিয়ার লিগের ১০৯টি খেলায় তিনি ৬টি হ্যাট্রিক করেন। যার ফলে তাকে শেষ ২২ বছরের প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল স্কোরার হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বাঙালি জাতিকে ঘরমুখো থেকে বইমুখো করেছেন যিনি। পড়তে ক্লিক করুন

দেশের হয়ে লুইজ সুয়ারেজ 

এতো গেল ক্লাবের ক্যারিয়ারের কথা। নিজের দলে, উরুগুয়েও কিন্তু নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০১০ বিশ্বকাপে দলকে এনে দেন ব্রেকথ্রু। তার নৈপুণ্যের ফলে ঘানাকে হারিয়ে চতুর্থ দল হিসেবে বিশ্বকাপ শেষ করে উরুগুয়ে। পাশাপাশি ২০১১ সালে নিজের দলকে ১৫ বার কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতে রেকর্ডেও তার অবদান অসামান্য।

সে বছর কোপা আমেরিকার আসরে প্লেয়ার অফ দ্যা টুর্নামেন্ট হন। ২০১২ সালে অলিম্পিক গেমসে দলের নেতৃত্ব দেন এবং চিলির বিরুদ্ধে হ্যাট্রিক করে সাড়া ফেলেন। একের পর এক সাফল্যে তিনি ২০১৩ সালে উরুগুয়ের স্টার তকমা নিয়ে কনফেডারেশন কাপ শুরু করেন। প্রথম ম্যাচেই স্পেনের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে সুয়ারেজ নিজ দেশের হয়ে ৪০তম গোল করার মাধ্যমে উরুগুয়ের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড় হিসেবে খ্যাত হন।

তবে বির্তক তার পেছনে খুব ভালো করে লেগে ছিলো। অন্য ফুটবলারের যখন ড্রাগ বা অসামাজিক কর্ম নিয়ে বিতর্ক, তখন তার বিতর্কের বিষয় কামড় কিংবা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ। এর শুরুটা হয়েছিলো তার ১৫ বছর বয়সে। তিনি একটি ফুটবল ম্যাচে রেফারির নাকে কামড় বসিয়ে রক্তপাত করে দেন।

 

 ফুটবলার লুইজ সুয়ারেজের সফলতার গল্প

 

বিতর্কিত লুইজ সুয়ারেজ 

২০১০ সালের ২০ নভেম্বর অ্যাজাক্সে খেলার সময় কথা কাটাকাটির একটা সময় মিডফিল্ডার ওটম্যান ব্যাকেলকে কামড় দিয়ে সাত ম্যাচ নিষিদ্ধ হন। তখন তাকে “ক্যানিবেল অফ অ্যাজাক্স” খ্যাতি দেওয়া হয়। তবে ইভানোভিচ ছিলেন সুরারেজের প্রথম আক্রমণের শিকার এবং সেটা অ্যাজাক্সে থাকাকালীন। ইভানোভিচকে কামড়ানোর দায়ে ১০ ম্যাচ দর্শক সারিতে থাকতে হয় তাকে।

এছাড়া আক্রমণাত্মক আচরণের জন্যে তাকে বহুবার জরিমানাও গুনতে হয়েছে। এমনকি ২০১৩ সালের ৫ই জানুয়ারী ম্যানস্ফিল্ড মাঠে তার বিরুদ্ধে হ্যান্ডবলের অভিযোগ ওঠে। একই বছরের এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে আবার কামড়ানোর অভিযোগ উঠলে তিনি ১০ ম্যাচের জন্যে নিষিদ্ধ হন।

২০১৪ সালের ব্রাজিল ওয়ার্ল্ড কাপে জার্জিও চিলিনিকে কামড়ানোর অপরাধে নয়টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্যে নিষিদ্ধ হন তিনি। কামড়ানোর এই স্বভাব সম্পর্কে সুয়ারেজ ছোটবেলা খাবার চেয়ে খাওয়ার ঘটনাকে দায়ী করেন।

কিন্তু সবকিছুর উর্ব্ধে উঠে আসে তার ফুটবল ক্যারিয়ার। কারণ ২০০৫ সালে ক্যারিয়ার শুরু করে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে মাত্র ১৪ সেশন খেলে ৫৩০ ম্যাচে ৩৪৮টি গোল এবং ন্যাশনাল টিমের হয়ে ৯৫ ম্যাচে ৪৯ গোল করে তিনি উরুগুয়ে সর্বাকালের সেরা খেলোয়াড় ডিয়েগো ফোরলাকে অতিক্রম করে যান।

প্রিয় এই ফুটবলারের জন্য রইলো অনেক অনেক ভালোবাসা আর শুভ কামনা। 

Share this

2 thoughts on “যুদ্ধে জয়ী লুইজ সুয়ারেজ, নারীই যার সফলতার রহস্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *