Vicky Zahed

আজ আমার পালাতে যে মৃত্যু দেখানো হয়েছে সেটা আমার ক্রোধের প্রতিফলন- ভিকি জাহেদ

ভিকি জাহেদ

তরুণ নির্মাতা ভিকি জাহেদ। ২০১৬ সালে প্রথম শর্টফিল্ম “মোমেন্টস” দিয়েই বাজিমাত করে দেন। বর্তমান বিনোদনে ইউটিউবকেন্দ্রিক যে বিপ্লব চলছে তার শুরুটা বলা চলে এই তরুণের হাত ধরে। তিনি শর্টফিল্মে মার্কেটিংয়ের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে বানিয়েছেন ১৫টির বেশি শর্টফিল্ম ও বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় মিউজিক ভিডিও। মেকিংয়ে নিজের নিজস্বতা দেখিয়েছেন। সাথে দেখিয়েছেন ভিন্নভাবে গল্প বলার ধরণ। তার গল্পে টুইস্টের একটা যথার্থ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তাই মি. টুইস্ট হিসেবেও তিনি খ্যাত। ফিল্ম মেকিংয়ে সফল হলেও মূলত এর বাইরেও তার আরো একটি পরিচয় রয়েছে। রয়েছে ফিল্ম নিয়ে নিজস্ব দর্শন, বাংলা সিনেমাকে নিয়ে স্বপ্ন। এসবই উঠে এসেছে সম্প্রতি অভিযাত্রী ডট কমের সাথে এক আলাপচারিতায়। এসব ছাড়াও কথা বলেছেন মুক্তির অপেক্ষা কাজ নিয়েও। পুরো ইন্টারভিউ শেষে থাকছে ভিডিও লিংকসহ তার সবগুলো শর্টফিল্ম নাম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ওয়াসিক সৈকত।

নির্মাতা ভিকি জাহেদের সাক্ষাৎকার

অভিযাত্রী: প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, অভিযাত্রীকে সময় দেওয়ার জন্যে। একদম শুরুতে আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, নির্মাণে আসলে কিভাবে আসা? সচেতনভাবেই নাকি শখের বসে?


ভিকি জাহেদ: নির্মাণে শখের বসে না, বরং সচেতনভাবেই আসা। কিন্তু আমার ব্যাকগ্রাউন্ড আসলে ফিল্মের না। আমি একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর Bangladesh University of Textile Engineering এ ভর্তি হই। তবে আমি ফিল্ম দেখতে খুব পছন্দ করতাম। আমার ডিভিডি কালেকশনের খুব অভ্যাস ছিলো এবং এখনো প্রচুর ডিভিডি কালেকশনে আছে। টিউশনির পয়সা জমিয়ে সব ডিভিডি কিনে সিনেমা দেখতাম। খুব ভালো লাগত এভাবে মুভি দেখতে।

আমার লাইফের টার্নিং পয়েন্ট ছিলো বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের “ফিল্ম অ্যাপ্রিশিয়েশন কোর্স”। ১১তম ব্যাচের ছাত্র আমি। তানভীর মোকাম্মেল স্যার ঐ কোর্সটা করান। উনার ক্লাস খুবই ভালো লাগত। উনি ব্যসিক্যালি চোখ খুলে দিয়েছিলেন। ক্লাসগুলো করে আসলে সিনেমা বুঝতে পেরেছি। তখন মনে হলো- এটা টোটালি ডিফ্রেন্ট ও ইন্টারেস্টিং একটা জগত। বুঝতে পেরেছিলাম এখানে আমার অনেক কিছু দেওয়ার আছে এবং আমি অনেক আনন্দ পাবো। তখন মনে হল আমার কিছু একটা বানাতে হবে। শর্টফিল্ম বা এই ভিসুয়্যাল মিডিয়া লাইনে কিছু করতে হবে। ভেতর থেকে সেই আর্টটা আসে। তারপর ধীরে ধীরে সময় চলে যেতে লাগল এবং নির্মাণে ঢুকলাম। তখন থেকেই চলছে।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মোমেন্টস
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: মোমেন্টস

 

অভিযাত্রী: ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বেশিরভাগ নির্মাতাই শুরুতে অনেক স্বপ্ন নিয়ে আসে যে, আমি ইন্ডাস্ট্রিতে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসবো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কিছু কাজ করার পর বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে এক সময় হারিয়ে যায় তারা আপনিতো অনেক দিন ধরেই কাজ করছেন, আপনার ক্ষেত্রেও কখনো এমন পরিস্থিতি এসেছিলো কিনা?


ভিকি জাহেদ: সত্যি বলতে, আমি আসলে ইন্ডাস্ট্রি চেঞ্জ করতে আসিনি। আমার একটা দর্শন আছে এবং আমি ঐ দর্শনকে সামনে রেখে কিছু কাজ করতে এসেছি, সিনেমা বানাতে এসেছি। আমার কাছে মনে হয়, ইন্ডাস্ট্রির ভালো খারাপ আসলে একটা আপেক্ষিক বিষয়। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি অনেক খারাপ। দেখা যাবে, আমাদের সাপেক্ষে অন্য একজনের কাছে, অন্য একটা ইন্ডাস্ট্রির কাছে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রি আসলে অনেক ভালো। সুতরাং এইটা একটা আপেক্ষিক বিষয়। এটা নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি।

আমার যতটুকু মনে হয়েছিলো, আমি একজন নির্মাতা হিসেবে কতটুকু কনট্রিবিউট করতে পারবো; আমি যখন সিনেমা বানাবো তখন আমি আমার ইন্ডাস্ট্রিকে কি দিচ্ছি। আমি যদি আমার শতভাগ দিতে পারি ওটাই হচ্ছে মুখ্য। বাকী সবকিছু গৌণ। আমি এসে ইন্ডাস্ট্রি চেঞ্জ করে দেবো বা এটা না হলে আমি হতাশ হয়ে যাবো– এই নীতিতে কখনো বিশ্বাসী ছিলাম না। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রত্যেকটা মেকার যদি এটা চিন্তা করে, সে শতভাগ সততার সাথে নির্মাণটা করবে, তাহলেই ইন্ডাস্ট্রি এমনিতে চেঞ্জ হয়ে যাবে।

 

অভিযাত্রী: অনেক নির্মাতারাই অভিযোগ করেন যে, তাদের কাছে চমৎকার গল্প আছে এবং একটা ভাল প্রোডাকশনের জন্য তারা যথেষ্ট প্রস্তুত কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত বাজেট নেই। আপনার কি মনে হয় নির্মানের যদি স্বদিচ্ছা থাকে তাহলে বাজেটের জন্য কোন গল্প আসলেই আটকে থাকে?


ভিকি জাহেদ: না, আমি একদমই এটা মনে করি না। তবে বাজেট বলতে একটা মিনিমাম অ্যামাউন্ট লাগে। কারণ ফিল্ম হচ্ছে একটা এক্সপেনসিভ মিডিয়া। যেমন- গল্প লেখার জন্যে কোন টাকা-পয়সা লাগে না, কবিতা লেখার জন্যে লাগে না। কিন্তু ফিল্ম বানাতে হলে কিছু টাকা অবশ্যই লাগবে। কিন্তু ঐটার কারণে আটকে থাকা সম্ভব না। কারণ এখন ব্যাপারগুলো সহজ হয়েছে। একটা সময় ছিলো যখন সবার হাতে হাতে মোবাইল ছিলো না। কিন্তু এখন সবার হাতেই মোটামুটি মানের ১০-১৫ হাজার টাকার একটা মোবাইল আছে। ঐটা দিয়েই কিন্তু ডে-লাইটে খুব ভালো একটা ফিল্ম বানানো যায়। এখন ফিল্ম বানানোর জন্যে যেটা লাগবে একটা ভালো গল্প। আর বাকী সবকিছু আপনার হাতে।

তাই আমার কাছে মনে হয় বাজেট একটা এক্সকিউজ। বাজেট কখনো কোন কারণ না। বস্তুত আপনি যদি একটা ভালো গল্প মাথায় তৈরী করতে পারেন, বাজেট কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আপনার যেটা করতে হবে, নূন্যতম একটা কিছু থাকতে হবে। আমার প্রথম শর্টফিল্ম “মোমেন্টস”-এ বাজেট ছিলো খুব কম। তাই ঐখানে আমি পরিশ্রমটা বেশি করি। পরিশ্রমটা বেশি করে কাজটা করি। কারণ যদি ঐটা ক্লিক করে, এরপরে তো পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। আমাদের প্রবলেম যেটা হয়ে যায়, প্রথমেই আমরা ভাবি, আমরা খুব বড় কিছু বানিয়ে ফেলবো বা খুব বিশাল একটা কিছু করে ফেলবো। ঐটা চিন্তা না করে জাস্ট একটা গল্প দিয়ে অডিয়েন্সের সাথে কানেকশনটা করতে হবে। এটা যদি আপনি করতে পারেন, একজন নির্মাতা হিসেবে আপনি সফল হবেন।

 

অভিযাত্রী: কি মনে হয় পরিচালক ভিকি জাহেদ এখন পর্যন্ত কতটা সফল?


ভিকি জাহেদ: মানুষ বলবে আমি কতটুকু সফল। নিজের চোখে বলতে গেলে বলব- আমি সবসময় একটা জিনিস মাথায় রাখি, অডিয়েন্সের জন্যে সিনেমা বানানোর চেষ্টা করেছি। সিনেমাতে আসার পেছনে দুইটি বড় কারণ ছিলো। একটা হচ্ছে, আমি সৃষ্টির আনন্দটা পেতে চাই। যেমন একটা সিনেমা আমি বানাই এবং সেটার প্রি-প্রোডাকশন, শুটিং, পোস্ট প্রোডাকশন রেডি হয়। যখন এটা আমি ইউটিউবে বা যেকোন মাধ্যমে দেখি, আমার খুব ভালো লাগে। আমার কাছে মনে হয় আমি কিছু একটা সৃষ্টি করতে পেরেছি। নিজেকে ঐ জায়গায় সৃষ্টিশীল চিন্তা করতে খুব ভালো লাগে। এইটা আমার অনেক বড় একটি লোভ ছিলো। আর দ্বিতীয় কারণ ছিলো- আমি অডিয়েন্সের সাথে কানেকশনটা করতে চেয়েছি সবসময়।

সত্যি কথা বলতে, আমি সবসময় চেয়েছি আমার ছবিটা যেন মানুষ দেখে এবং সবাই যেন বুঝতে পারে, গ্রহণ করতে পারে এবং একটা ফিডব্যাক দিতে পারে। আমি এমন ছবি বানাতে চাইনি যা মানুষ দেখবে কিন্তু বুঝবে না বা মানুষ কিছুক্ষণ দেখে বাকিটা আর দেখলোই না। কিংবা এতটা উচ্চমার্গীয় কিছু হলো যা মানুষের ধারে কাছে দিয়েও গেলো না। আমার ইচ্ছা ছিলো আমি ছবি বানাবো, এটা সবাই দেখবে, বুঝবে এবং রেসপন্স করবে। এখন পর্যন্ত যদি সেটা বলতে বলেন তাহলে আমি বলব, আমার যে উদ্দেশ্যটা ছিলো ঐ পথেই যাচ্ছি। কারণ আমার অডিয়েন্সই আসলে সিনেমা নির্মাণের অনুপ্রেরণা এবং তাঁরা ভালো রেসপন্স করছে বলেই আমি একটার পর একটা কাজ করছি। যেদিন তাঁরা রেসপন্স করা বন্ধ করে দিবে সেদিন আমি সরে যাবো। এটা হচ্ছে আমার নিজের সাথে নিজের একটা প্রতিশ্রুতি।

 

অভিযাত্রী: শিল্পের অন্যান্য শাখার মত চলচ্চিত্রেরও দুটি ধারা প্রচলিত। তার একটি হচ্ছে জনপ্রিয় ধারা এবং অন্যটি ধ্রুপদী। আপনার অধিকাংশ কাজই বিপুল জনপ্রিয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি দর্শক জনপ্রিয়তায় প্রভাবিত হয়ে নির্মাণ করছেন, নাকি নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছেন?


ভিকি জাহেদ: জনপ্রিয়তাটা মুখ্য বিষয় না। আমি যেটা বলছি, অডিয়েন্স কানেকশন। আমি একটা কাজ করলাম এটা দেখে খুলনার একটা ছেলে একটা কমেন্ট করলো, কাজটা তার খুব ভালো লেগেছে। কাজটা দেখে সে কিছু একটা শিখেছে বা তার লাইফে কাজটার কোন একটা প্রভাব পড়েছে। এই জিনিসটা আমাকে খুব শান্তি দেয়। অথচ আমি কিন্তু ঢাকায় বসে একটা কাজ করেছি। এখন কলকাতায় আমাদের কাজ অনেক দেখে। ইন্ডিয়ায় কিন্তু প্রচুর ফ্যান আছে আমাদের। ইন্ডিয়ার সেই ছেলেটা আমার কাজ দেখে ইন্সপায়ার্ড হচ্ছে। ইন্সপায়ার্ড হয়ে সে মেকিং করছে বা তার জীবনে কোন একটা পরিবর্তন আসছে। এই জিনিসটা আমার কাছে খুব ভালো লাগে।

আমি ফিল করি, এটা একজন ফিল্মমেকারের জন্যে অনেক বড় একটা ব্যাপার। ধ্রুপদী ধারা অবশ্যই আছে। সেটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি অডিয়েন্সের সাথে কানেকশনের জন্যে সিনেমা বানাই। এখন এটিকে যদি কেউ জনপ্রিয়তার সাথে মিলিয়ে ফেলে তাহলে সেটা তার ব্যাপার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অডিয়েন্সের সাথে যে কানেকশন বা যোগাযোগটা, আমার ইচ্ছা আছে সবসময় রক্ষা করার।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মায়া
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: মায়া

 

অভিযাত্রী: সামনে দর্শকদের জন্য আপনার কি কি কাজ অপেক্ষা করছে?


ভিকি জাহেদ: ২০১৮তে আরো কয়েকটা কাজ আসবে। অনেকগুলো কাজ লাইনআপে আছে। আমি শর্টফিল্মগুলোর কথা বলি, “মন” নামে একটা শর্টফিল্ম আসছে। সিয়াম-নাদিয়া এখানে অভিনয় করেছে। এটার শুটিং শেষ। এটি ধ্রুব টিভি থেকে শীঘ্রই আসবে। এছাড়া আফরান নিশো ভাইয়া আর সাফা কবিরের সাথে “দ্যা লাইফ অফ জলিল” নামে একটা শর্টফিল্ম আছে। এটারও শুটিং শেষ, পোস্ট প্রোডাকশনে আছে। তানজিন তিশা ও তৌসিফের সাথে “অ্যানাদার লাভ স্টোরি”-র শুটিং শেষ। এটা ইনশাআল্লাহ্‌ সামনে আসবে। আর জোভান-সামিয়া অথৈয়ের সাথে শর্টফিল্ম “লিটল হোম ক্যাফে” এটারও শুটিং শেষ, আসছে। সামনে মোটামুটি চারটা শর্টফিল্ম অডিয়েন্স পাবে। এছাড়া বেশ কিছু মিউজিক ভিডিও আসছে।

 

অভিযাত্রী: যদিও শিল্পী কখনো নিজের কাজে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। ইতোমধ্যে আপনি মোমেন্টস, অক্ষর, মায়া এবং সবশেষে আজ আমার পালাসহ অনেক কাজ করেছেন। এর মধ্যে কোন কোন কাজে ডিরেক্টর ভিকি জাহেদের চিন্তার প্রতিফলনটা ঠিকঠাকভাবে হয়েছে বলে মনে হয়?


ভিকি জাহেদ: এটা যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে আমি কয়েকটা কাজের নাম বলতে চাই। যেগুলোতে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি এই কারণে যে, যেহেতু আমি সবসময় একটা প্রোপার সিনেমা বানাতে চাই। প্রোপার ফিল্ম বলতে যে ফিল্মগুলো বানিয়ে একজন ফিল্মমেকার গর্ব অনুভব করে যে, টেকনিক্যালি আমার ফিল্ম, সাউন্ডের কাজ, পোস্ট প্রোডাকশন, প্রি-প্রোডাকশনসহ সবকিছু মিলিয়ে একটা কারেক্ট ফিল্ম। এটা সবসময় আমার বানানোর ইচ্ছা। কারেক্ট ফিল্ম বলতে বুঝাচ্ছি যেখানে সিনেমার যারা বোদ্ধা আছে তাঁরা ব্যকরণগত কোন ভুল ধরতে পারবে না। এই টাইপ ফিল্ম সবসময় বানাতে চাই। এভাবে বানিয়েই আমি কানেকশন করতে চাই অডিয়েন্সের সাথে। অনেকে শুধু টেকনিক্যাল সাইডের দিকেই নজর দিয়ে বলে আমার ফিল্মটা পারফেক্ট ফিল্ম হতে হবে। সেটা করতে গিয়ে অনেকসময় অডিয়েন্সের সাথে কানেকশনটা ছুটে যায়। আমার ইচ্ছা দুটোই করা। আমি একটা সাউন্ড ফিল্ম বানাবো। ওটা বানিয়েই আমি কানেকশন করবো। সবসময় আমি সফল হই না, কিন্তু কিছু প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে আমি সফল হয়েছি, যেমন- মোমেন্টস তার মধ্যে অন্যতম একটি কাজ। এটা আমি ঐ সময়ে যতটুকু জ্ঞান ছিলো ঐ অনুযায়ী বানিয়েছিলাম। টেকনিক্যালি একটা সাউন্ড ফিল্ম। ওই সময় অনুযায়ী ছিলো এবং অডিয়েন্সের সাথে কানেক্ট করতে পেরেছিলো। এছাড়াও জন্ম একটা শর্টফিল্ম আমি এবছর বানিয়েছি। “জন্ম” কে টেকনিক্যালি আমি বলব আমার ওয়ান অফ দ্যা বেস্ট ওয়ার্ক। কারণ এটা আমরা হারিকেনের আলো দিয়ে শুট করেছিলাম। তাই এই শর্টফিল্মটা আমার কাছে ভালো লাগে। এটি একটি টেকনিক্যাল সাউন্ড ফিল্ম এবং অডিয়েন্সের কাছেও মোটামুটি ভালো রেসপন্স পেয়েছি। এছাড়াও অক্ষর নামে আরেকটা শর্টফিল্ম ছিলো। এটা বানিয়ে আমি সন্তুষ্ট।

আর সম্প্রতি “আজ আমার পালা”। “আজ আমার পালা”-তে আত্মতৃপ্তি এসেছে এই জন্যেই যে, এটা আমার নিজের গল্প ছিলো না। আমি বানানোর আগে অনেক টেনশনে ছিলাম। কারণ অন্যগুলো তো আমার নিজের গল্প। আমার গল্প আমি বানিয়েছি, কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু এটা আরেকজনের গল্প যেটা ইতোমধ্যে জনপ্রিয় এবং মানুষ পছন্দ করেছে। এখন আমি যদি ভিজুয়্যালি উনার গল্পটাকে ঠিকভাবে না তুলে ধরতে পারি তাহলে কিন্তু উনার গল্পটার উপর সুবিচার করা হবে না। এজন্যে আমি খুব প্রেশারে ছিলাম। তাই প্রেশারে কাজ করা হয়েছে এবং আল্টিমেটলি যখন রিলিজ হয়েছে ফিডব্যাকটা পাওয়ার পর বুঝলাম যে, আমরা সফল। তাই “আজ আমার পালা” বলতে পারেন এমন একটা কাজ যেটাও আমি রাখবো টপ কাজগুলোর মধ্যে।

শর্টফিল্ম: আজ আমার পালা

 

অভিযাত্রী: বাংলাদেশে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নেই বললেই চলে। আপনার সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে কোন আগ্রহ আছে কিনা?  


ভিকি জাহেদ: আমার ফেসবুক প্রোফাইলের বায়োতে একটা লাইনই লেখা, “I am a story teller.” মানে আমি গল্প বলতে চাই সব সময়। এখন গল্প বলার জন্যে আমি দেখলাম ফিল্ম মিডিয়া সবচেয়ে বেশি ইন্টারেস্টিং। এজন্যে আমি ফিল্মে এসেছি। তাই ফিল্মের প্রতি ভালোবাসা পরে, আগে গল্পের প্রতি ভালোবাসা। যার কারণে যে কোন কাজে আমার গল্পটা আগে রেডি হয়। গল্পের ক্যারেক্টারগুলো নিয়ে আমি খেলি। ওদের সাথে কথা বলি, ওদিকে স্টোরির গঠনটা করি, লাইনআপটা করি। আমার কাছে গল্পটা ফার্স্ট প্রায়োরিটি। আমি নিজেও অনেক বই পড়েছি, এখনো চেষ্টা করি পড়ার এবং গল্পের প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা, অনেক ভালোলাগা। আর আমাদের আশেপাশে সব জায়গায় গল্প। আমাদের জীবনটাই কিন্তু গল্পময়।

আমার প্রথম প্রেমই হচ্ছে গল্প। বর্তমানে সাহিত্যনির্ভর ছবি বাংলাদেশে খুব কম। কিন্তু এটা হওয়া উচিৎ। বাইরের কান্ট্রিতে এত বেশি হয় কিন্তু আমাদের দেশে কেউ করে না। “কেন করে না” এটা আমি আসলে জানিনা। যেমন- সম্প্রতি হুমায়ূন আহমেদ স্যারের একটা উপন্যাস “দেবী” নিয়ে কাজ হলো। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের কিন্তু অনেক গল্প পড়ে আছে। ওগুলো দিয়ে কোন কাজ হচ্ছে না। আমার মনে হয় এই দিকটাতে একটু খেয়াল করা উচিৎ।

অভিযাত্রী: যেহেতু আপনি একজন সাহিত্যপ্রেমী। তাই জানতে চাচ্ছি, কার লেখা পড়া হয়? কোন ড্রিম গল্প আছে কি না যেটাতে কাজ করতে চান?


ভিকি জাহেদ: আমার কাজে, লেখায় হুমায়ূন আহমেদ স্যারের অনেক প্রভাব আছে। কারণ আমি স্যারের অনেক বড় একজন ভক্ত। আমি তাকে অনেক রেসপেক্ট করি এবং স্যারের যে গল্প বলার ক্ষমতা এরকম ক্ষমতা আমি অন্য কারো মধ্যে পাইনি। এছাড়াও আমি স্টিফেন কিংয়ের অনেক বড় একজন ভক্ত। উনার লেখার মধ্যে অন্যরকম একটা স্টাইল আছে। আমি এই দুইটা লোক দ্বারা অনেক প্রভাবিত। আর ড্রিম গল্প হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের “জনম জনম” উপন্যাসটিকে সেলুলয়েডে আনার ইচ্ছা রয়েছে।

 

অভিযাত্রী: সম্প্রতি “আজ আমার পালা” শর্টফিল্মটি ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বর্তমান সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি ইস্যু নিয়ে এমন একটি নির্মাণ সময়ের দাবী ছিল। এই শর্টফিল্মটির চিত্রনাট্য, সংলাপ বা গল্প বলার ধরণ প্রতিটা বিভাগেই দারুণ কম্বিনেশন। অনেকেই বলে যে, চলচ্চিত্র শুধুই বিনোদন, এখানে শেখানোর কিছু নেই। “আজ আমার পালা” আপনি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই করেছেন কিনা?


ভিকি জাহেদ: চলচ্চিত্রকে আমি শুধুই বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে একদমই মনে করি না। সিনেমা অনেক বড় শিক্ষক। আমি আমার লাইফে অনেক লেসন আমি স্কুল-কলেজ থেকে পাইনি, সিনেমা থেকে পেয়েছি। তাই সিনেমা শুধু নিছক বিনোদনের মত হালকা বিষয় নয়। আর “আজ আমার পালা” পুরোপুরি দায়বদ্ধতা থেকে করা নয়। আমি যখন গল্পটা পড়ছি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে এবং আমার কাছে মনে হয়েছে এটা দিয়ে খুব সুন্দর একটা শর্টফিল্ম হবে।

পাশাপাশি মেয়েদের উপর শারীরিক লাঞ্চনা আমাকে সবসময় মানসিকভাবে আঘাত করে। আমি এর আগে গত বছরেও হ্যারাসমেন্ট নিয়ে কাজ করেছিলাম “রূপ” নামের একটা শর্টফিল্মে। মেয়েদের সাথে এই ধরণের লাঞ্চনা আমাকে খুব রাগান্বিত করে। কিন্তু আমি সরাসরি কিছু করতে পারি না। তখন আমার নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। এই আক্ষেপ থেকে মনে হলো, আমি কিছু একটা বানাই যাতে সেই ক্রিমিনালটি ভয় পাবে এবং ভাববে আমি যদি করি তাহলে আমার সাথে এমন হতে পারে। এর কারণে “আজ আমার পালা”-তে ইচ্ছা ছিলো এমন একটি মৃত্যু দেখাবো যাতে মানুষ ১০ বার ভাবে। সুতরাং বলতে পারেন, “আজ আমার পালা”-তে যে মৃত্যু দেখানো হয়েছে ঐটা আমার ক্রোধের প্রতিফলন।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অবিশ্বাস
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: অবিশ্বাস

অভিযাত্রী: আপনার বেশিরভাগ কাজ রোমান্টিক ঘরনার। অন্যদিকে, আমরা যতদূর জানি আপনার পছন্দের ধরণ হলো– থ্রিলার। এর সত্ত্বেও রোমান্টিকে কাজ বেশি করার কারণটি কি?


ভিকি জাহেদ: আমার অলটাইম পছন্দের জনরো হলো– থ্রিলার ও হরর। আমি হরর মুভির অনেক বড় ভক্ত। আর রোমান্টিক কাজগুলো আমি এমনি দেখতাম। কিন্তু ফ্যান ছিলাম না। আর রোমান্টিক কাজ করার মূল কারণ হলো– বাস্তবতা। আমার মাথায় ছিলো যে, আমি বেশি সুযোগ পাবো না। আমি হয়ত একটা বা দুইটা সুযোগ পাবো, এর থেকেই আমার নিজেকে মানুষের কাছে চেনাতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ বা আমাদের উপমহাদেশের মানুষ রোম্যান্সটা বেশি পছন্দ করে। আমাদের প্রেম-ভালোবাসা খুব ভালো লাগে। আমরা এটাতে খুব ইজিলি ইমোশনাল হই, খুব ইজিলি কানেক্টেড হই। আমি সবসময় অডিয়েন্স রিসার্চ করে কাজ করি। তো ঐ সময় আমার এটাই মনে হয়েছে– আমি তো নতুন মেকার। আমাকে খুব বেশি মানুষ সুযোগ দিবে না। আমি এক্সপেরিমেন্ট করতে পারবো না। মানুষ যেটা পছন্দ করে ঐখানেই আমাকে সর্বোচ্চ দিতে হবে। মানুষ রোম্যান্স পছন্দ করে। এর জন্যেই আমি “মোমেন্টস” বানিয়েছিলাম।

আমি থ্রিলার বানাইনি, আমি হরর বানাইনি, আমি রোম্যান্স নিয়ে এগিয়েছি। আমার আইডিয়াটা ঠিক ছিলো। মানুষ কিন্তু ক্লিক করেছে। মোমেন্টসের পর আমরা “অবিশ্বাস” বানালাম। ঐটা প্রেম ছিলো না। একটু ডিফ্রেন্ট ছিলো। মোমেন্টসের পর রোমান্টিক কাজগুলোই আসা শুরু করেছে। এরপর মায়া বানালাম, অক্ষর বানালাম এবং টানা বেশ কয়েকটা রোমান্টিক কাজ হয়ে গেল। এরপর আমি নিজে একটা সময় হাঁপিয়ে গেলাম। ঐসময় আমি “রূপ” বানিয়েছিলাম, একটু ডিফ্রেন্ট করার জন্যে। এখন কিন্তু আমি এক্সপেরিমেন্ট করছি। সব কাজ কিন্তু রোমান্টিক না। যেমন- জন্ম, বান্ধবীসহ বেশ কিছু কাজ। তবে প্রথম দিকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতার কারণেই আমি রোম্যান্স বানিয়েছিলাম।

অভিযাত্রী: আপনিতো একজন ডিজিটাল মার্কেটার। ডিজিটাল ফ্লাটফর্মে আপনার শর্টফিল্মগুলো দুর্দান্ত পারফর্ম করার রহস্য কি এটাই?


ভিকি জাহেদ: আমাদের যেটা সবসময় অভাব ছিলো– আমরা ফিল্ম প্রমোশন করতাম না। ফিল্ম মার্কেটিংটা আমাদের ইন্ডাস্ট্রি বুঝতোই না। কিন্তু এখন অনেক উন্নত হয়েছে। আসলে ফিল্ম শুধু বানালেই হয় না, ফিল্মটা অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাতে হবে। ঐ পৌঁছানোর কায়দা কিন্তু আমরা ৩ বছর আগেও করিনি, আমাদের মাথায়ই ছিলো না। আমরা ভাবতাম– ফিল্ম বানালাম মানুষ তো এমনি এসে দেখবে। কিন্তু না। আপনার ফিল্মটা বানানোর পর ওটাকে সুন্দর করে প্যাকেট করে মানুষের কাছে দিয়ে আসতে হবে। তারপর মানুষ সেটা দেখবে। আমি যেহেতু ঢাকা ভার্সিটির এমবিএতে মার্কেটিংয়ের স্টুডেন্ট ছিলাম, তাই মার্কেটিং জিনিসটা মাথায় থাকে। একইসাথে মাথায় ছিলো– আমি ফিল্ম বানালে প্রোপার প্রমোশনের সাথে যাবে, একটা হাইপ ক্রিয়েট করতে হবে মানুষের মধ্যে। তাহলেই মানুষ দেখবে। তাই আমার কাছে মনে হয়, আমার ক্লিক করার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে– আমি প্রমোশনটা আগে প্ল্যান করি।

অভিযাত্রী: একটি ইন্টারভিউতে আপনি নিজেকে পার্ট-টাইম ফিল্মমেকার হিসেবে বলেছেন। এর পাশাপাশি আপনি অন্য একটি পেশায় যুক্ত আছেন। তাহলে কি ফিল্মমেকিংকে ফুলটাইম হিসেবে নেবার মত পরিবেশ এখনো আমাদের দেশে তৈরী হয়নি?


ভিকি জাহেদ: নাহ, আমার তা মনে হয় না। ফিল্মমেকিংকে ফুলটাইম হিসেবে নেবার পরিবেশ আছে। আসলে আমি কোয়ান্টিটিতে বিশ্বাসী না, কোয়ালিটিতে বিশ্বাসী। আমি একটা কাজ করলে সময় নিয়ে করি। একটা শর্টফিল্ম করার জন্যে কমপক্ষে একমাস সময় নেই। যেটা ফুলটাইম হিসেবে কাজ করলে সম্ভব না। পাশাপাশি আমি মার্কেটিংটা উপভোগ করি। উপভোগ না করলে আমি করতাম না। নইলে আমি হয়ত ফুলটাইম ফিল্মমেকিং করতাম। মার্কেটিংয়ে আমি অনেক কিছু শিখি যেটা আমার ফিল্মগুলোতে কাজে লাগে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন কেউ যদি ফিল্মমেকিং করে বাঁচতে চায় সে বাঁচতে পারবে।

অভিযাত্রী: আপনার পরিচালনায় ফিচার ফিল্ম কবে দেখতে পাচ্ছি?


ভিকি জাহেদ: এখন যা করছি এগুলো ফিচার ফিল্মেরই প্র্যাকটিস। তবে আমি তাড়াহুড়ো করতে চাই না। কারণ আমি প্রথম ফিল্মে চাই– যেভাবে মানুষ আমার শর্টফিল্ম পছন্দ করেছে, ফিল্মটাও যেন মানুষ পছন্দ করে। বেঁচে থাকলে কোন এক সময় করবো। কিন্তু তাড়াহুড়ো নেই।

 

অভিযাত্রীকে সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। শুভকামনা রইল আপনার জন্য। 


ভিকি জাহেদের আলোচিত শর্টফিল্মের তালিকা:

  1. মোমেন্টস (২০১৬)
  2. অবিশ্বাস (২০১৬)
  3. মায়া (২০১৬)
  4. দেয়াল (২০১৬)
  5. অক্ষর (২০১৭)
  6. দূরবীন (২০১৭)
  7. রূপ (২০১৭)
  8. দ্যা হিরো (২০১৭)
  9. আলো (২০১৭)
  10. বীর (২০১৭)
  11. জন্ম (২০১৮)
  12. বান্ধবী (২০১৮)
  13. আজ আমার পালা (২০১৮)

ভিকি জাহেদের সাক্ষাৎকারটি ২৭ নভেম্বর ২০১৮ইং তারিখে অভিযাত্রীর পক্ষ থেকে গ্রহণ করেছেন ওয়াসিক সৈকত।

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *