মাহরীন ফেরদৌসের গল্প

মাহরীন ফেরদৌসের গল্প | ভুলে থাকার গল্প

মাহরীন ফেরদৌসের গল্প: 

ভুলে থাকার গল্প

মাহরীন ফেরদৌস


আমার জানামতে ওদের পরিচয় হয়েছিল আমারই বিয়ে উপলক্ষে। আমার গায়ে হলুদে বেশ কিছু নাচ, গান আর ম্যাজিক দেখানোর আয়োজন করা হয়েছিল। যা আজকাল সব হলুদেই হয় আর কি। আমার বন্ধু-বান্ধবী, কাজিনরা যখন মহা উৎসাহে জামা-কাপড়, গহনা, গান নিয়ে কথা বলছিল, আমি তখন সাফ সাফ ঘোষণা দিয়ে দিলাম, কোন হিন্দি গান বাজানো যাবে না। বাংলা গান হবে শুধু। কলকাতার বাংলা হলেও চলবে। কিন্তু হিন্দি গানের পানি, পানি, সানি সানি কেউ আশা করে থাকলে সেই আশায় বরং গুড়েবালি। শুনে মুষড়ে পড়েছিল অনেকেই তবে আশাভঙ্গ হয়নি কারণ এ সময়ে বাংলা গানেও অনেক হিন্দি শব্দ আর আইটেম গানের ছড়াছড়ি। সরাসরি খেতে না পারলেও অন্তত ঘুরিয়ে বেশ খাওয়া যাবে।

আমার হলুদ উপলক্ষে আরও অনেকের মতো ওরা দুজনও জুটি বাঁধল। কোন একটা মজার গানে নাচবে। আমার তখন মহা ব্যস্ততা। সকাল থেকে বিকেল অফিস করি, এরপর বিয়ের কেনাকাটায় যাই। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। এসে দেখি সন্ধ্যা থেকে ওরা অনেকে নাচের রিহার্সেল করছে। বসার ঘরের আনাচে কানাচে পড়ে আছে অজস্র খালি চায়ের কাপ আর কোকের বোতল। একই গানের লাইন বার বার শুনতে শুনতে বাসার সবার কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছে। শুধু আমার আব্বা-আম্মা একদম বিরক্ত হচ্ছেন না। তাঁদের কাছে আনন্দ লাগছে। তাঁদের মেয়ের বিয়ে, সেই উপলক্ষে আনন্দ। আমি দেখি আমার ঝাঁকড়া চুলের সেই বন্ধু আর গালে তিল থাকা বান্ধবী নাচের মুদ্রা নিয়ে একে অন্যের সাথে খুব গল্প করছে।

ঝাঁকড়া চুলের বন্ধু আমার স্কুল জীবনের। একসাথে কোচিং করতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল। গালে তিল থাকা বান্ধবী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি। সপ্তাহখানেক আগেও এরা কেউ কাউকে তেমন চিনত না। অথচ এখন দেখে মনে হচ্ছে যুগ যুগ ধরে পরিচিত। আমি আগ বাড়িয়ে সবার খবরাখবর জিজ্ঞেস করি। একে একে সবাই নিজের নাচের কিংবা গানের রিহার্সেল দেখায় আমাকে। হাসিমুখে বসে থাকি। অথচ আমি ভেতরে ভেতরে খুব ক্লান্ত। ইদানীং রাতে ঘুম হয় না। এটা কি বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় নাকি অফিস, বাসা, বিয়ে, কেনাকাটা এসবের চাপের কারণে তা আমি জানি না। আমার হবু জীবন সঙ্গীর সাথেও খুব বেশিক্ষণ ফোনে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। থেকে থেকে বরং কেমন যেন বিষাদ কাজ করে মনে। বসার ঘরের ফ্যানের দিকে আমি হা করে তাকিয়ে থাকি যেন এভাবে তাকালেই ফ্যানের পাখাগুলো ছুটে এসে আমার দুই বাহুতে ডানার মতো জুড়ে যাবে আর আমাকে নিয়ে যাবে কোন সুদূরে। এভাবে ঠিক কতক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকি নিজেও জানি না। মনে পড়ে যায় কিছুদিন আগে ইউটিউবে একটা পিয়ানোর সুর শুনেছিলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মত। না, মোৎজার্ট বা বিথোফেন নয়। একদম আনকোরা নতুন এক শিল্পী। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়স তার। সেই সুরের দ্যোতনায় পাগল হয়ে উঠেছিল এক আফ্রিকান লোক। সে মন্তব্যঘরে লিখেছিল,

‘তোমরা কেউ কি শুনতে পাচ্ছ? আমার মৃত্যুর সময় এই সুর শুনে আমি পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাই।’

তারপর সেখানে আরও জনাতিনেক মানুষ এসে মন্তব্য করেছিল,

আমিও

আমিও

আমিও   

আমার ইচ্ছে হয়েছিল সেখানে একই কথা লিখে আসি। কিন্তু পারিনি। কারণ মৃত্যু নিয়ে ভাবার কোন কারণ আমার নেই। আমি নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি। ঘর-বাঁধা কী সুন্দর একটা স্বপ্নের নাম অথচ কেমন বন্দি বন্দি ঘ্রাণ আসে সেখান থেকে। আমি চিন্তাজাল ছিন্ন করি। বসার ঘরের সবাই রাতের খাবার খেয়ে বিদায় নেয়। এ বাসায় এখন প্রতি বেলায় ডজন, ডজন মানুষের রান্না হয়। বিয়ের দিন আরও ঘনিয়ে আসতে শুরু করলে না জানি কি হবে!

আমার গালে তিল থাকা বান্ধবী বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে। বহুদিন থেকেই। তার সমস্যা হলো কাউকেই তার খুব বেশিদিন ভালো লাগে না। সবার মাঝে কিছু না কিছু কিন্তু থেকে যায়। অথচ সে জীবন সঙ্গী পাওয়ার জন্য পাগল। একা থাকার সাথে এখনও আপোষ করে উঠতে পারেনি।  জেনেছি স্কুল জীবন থেকে সে এমন। প্রেমিক কিংবা প্রেমিকরুপী বন্ধু ছিল সব সময়ই। হয়ত এখনও কেউ না কেউ আছে। আমার জানা নেই। আমার ঝাঁকড়া চুলের বন্ধুটি আবার বেশ ভাবুক। আমি জানি, বাড়ি যাওয়ার পথে সে যে গানটির সাথে নাচবে সেটি শুনতে থাকবে। আমি জানি, ঘরে ফিরে সে শিখে যাওয়া নাচের মুদ্রা মনে করার চেষ্টা করতে থাকবে। সে মোহাম্মদপুরের বাসায় একা থাকে এখন। আগে চশমা পরা একটা মেয়ের সাথে থাকত। দুজনে একসাথে বাজার করত। ও মাংস কেটে দিত, মেয়েটি রাঁধত। ওদের বাসায় আড্ডা দিতে গেলে মানিপ্ল্যান্ট গাছের টবে কনডমের ছেঁড়া প্যাকেট পাওয়া যেত। গা ঘিন ঘিন করত আমার। মনে হতো ওদের ভালোবাসার ছাপ হয়ত পড়ে আছে বসার ঘর, খাবার ঘর, রান্নাঘর সহ সর্বত্র। আমি অল্প সময় থেকে চলে আসতাম। ঝাঁকড়া চুলের বন্ধুর সেই সম্পর্কটা একদিন ভেঙে গেলো। কারণ সবকিছু নিয়েই অতিরিক্ত সিরিয়াস ছিল। চশমা পরা মেয়েটিকে সারাদিন মেসেজ করত। মোবাইলের প্যাকেজের সাথে সে একশত ভালোবাসার কবিতা ফ্রি পেয়েছিল। কাজে চলে গেলে রোজ তিনটা করে মেসেজ পাঠাত। আর ফিরতি মেসেজ না পেলে গণ্ডগোল করত খুব। মেয়েটার অফিসের সামনে ছুটি হবার আগেই চলে যেত। ওর ছেলেবন্ধুদের সহ্য করতে পারত না। গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের সাথে বেশি কথা বললে খেপে যেত। একদিন বাড়িওয়ালা নোটিশ দিলো, ‘এভাবে বিয়ে না করে একসাথে থাকা যাবে না। মাগিবাজির জায়গা এটা না।’ আমার বন্ধু নোটিশ পড়ে বাড়িওয়ালাকে গিয়ে শাসিয়ে এসেছিল। পাড়ায় ওর কিছুটা পরিচিতি ছিল। তাই এসব কিছুর পরেও বাড়ি ছেড়ে দিতে হলো না। তবে প্রেমিকা মেয়েটি সেদিন লম্বা সময় জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। অস্বচ্ছ হয়ে এসেছিল ওর চশমার কাচ। কেঁপে কেঁপে উঠছিল পাতলা ঠোঁট। বন্ধু বলল, ‘আর কেঁদো না। চল বিয়ে করে ফেলি।’ মেয়েটি রাজি হয়নি। একসাথে থাকা যত সহজ, জীবন কাটানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া তত সহজ না। কিংবা সে হয়ত মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল আমার বন্ধুর অতিরিক্ত সিরিয়াসনেস দেখে। এদিকে বন্ধু আরও মরিয়া হয়ে গেলো। সকাল সন্ধ্যা ভালোবাসার কবিতার সাথে যুক্ত হলো বিয়ের প্রস্তাব। মেয়েটি বাড়ি ফিরে দেখে ঘর পরিষ্কার, ভাতের সাথে ডিম ভুনা, আলু ভর্তা রান্না হয়ে গিয়েছে। আমার সিরিয়াস বন্ধু নিজেকে স্বামী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। মেয়েটি চুপ করে গেলো খুব। যেন হারিয়ে গেলো নিজের মাঝেই। শুধু বিয়ের কথা তুললেই শান্ত স্বরে বলত- ‘না।’

আমরা বাঙালিরা ‘না’ শব্দটিকে প্রত্যাখ্যান হিসেবে কম কমই বিচার করি। আমরা ভাবি ‘না’ মানেই ‘হ্যাঁ’, কিংবা ‘হয়ত’, ‘হতেও পারে’ এমন কিছু। আমার বন্ধুটিও তাই ভেবেছিল। সে কারণে সে মেয়েটির অফিসের সামনে যাওয়া বাড়িয়ে দিলো, মেসেজ, ফোনকল, স্ট্যাটাস, রান্না, ঘর গুছানো সব কিছু রাখতে থাকল টিপটপ। তবে অপর পক্ষ থেকে কোন পরিবর্তন না দেখে সে একদিন বাধ্য হয়ে মেয়েটির গ্রামের বাড়িতে ফোন করে একদিন জানিয়ে দিলো দুজনের একসাথে থাকার কথা। ভাবল, লোক জানাজানি আর সমাজের ভয়ে এখন নিশ্চয়ই মেয়েটির পরিবার তার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য খুব চাপ দিবে। কিন্তু এমন কিছু হলো না। সব জেনে মেয়েটি গেলো রেগে। বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। সবকিছু থেকে ব্লক করে দিলো ওকে। আর ফিরে আসল না। সেদিনের পর এক মৃত দুপুরে বন্ধু আমার সামনে বসে বসে অনেক কাঁদল। অনেক। তারপর বলল, ‘সব ভুলে যাবো। কোন কিছু মনে রাখতে চাই না।’ আমি উত্তরে বললাম- ‘হুম। কেউ কেউ ভুলে যায়। কেউ কেউ সব ভুলে যেতে পারে। যারা পারে তারা ভাগ্যবান। ভাগ্যবানের কোটায় সবার স্থান হয় না।’

আমার বন্ধুটি তখন আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘খুব কষ্ট খুব। কিছুতেই ওকে ভুলতে পারছি না।’

বর্তমানে আমার গালে তিল থাকা বান্ধবীর সাথে পরিচিত হয়ে হয়ত বন্ধুটি তার খুব কষ্ট কমানোর কিছুটা হলেও গতি পেয়েছে। গতি তো আমিও পেয়েছি। এই যে বিয়ে করতে যাচ্ছি। উদ্দেশ্যহীন এক জীবনের প্রচলিত গতির নামই তো বিয়ে। আমার হবু জীবনসঙ্গী সম্ভবত একজন ভালো মানুষ। সে কোন কিছু নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করে না। তবে বউ শব্দটা নিয়ে তার মনে খুব কোমল, পেলব এক ধরণের কল্পনা আছে। সেই কল্পনার পোশাকে আমি পুরোপুরি ফিট না করলেও সে কেন যেন আমাকে পছন্দ করে। কিংবা ভাব দেখায় পছন্দ করছে। আমিও তার সাথে ভালো থাকার প্রচ্ছন্ন ভাব দেখাই। যেন এটা আমাদের দুজনের খেলা, এখন ভাব, ভাব, ভাব। পরে আড়ি, আড়ি, আড়ি।

 

এক মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খুব ঘরোয়া পরিবেশে আমাদের কাবিন হয়ে যায়। ভারী একটা গোলাপি কাতান শাড়ির নিচে আমি ভেতরে ভেতরে হাঁসফাঁস করতে থাকি। যেন কোন পাখির ডানা চেপে ধরে তাকে মানুষের পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার হবু স্বামীও রুমাল দিয়ে ঘন ঘন ঘাম মোছে। সেও হাঁসফাঁস করছে তবে ডানা ঝাপটানোর জন্য নয়, অতিরিক্ত গরমে। দেখতে দেখতে আমাদের হলুদ সন্ধ্যা চলে আসে। ফটোগ্রাফারের কথা শুনে বিচিত্ররকমের ছবি তুলতে তুলতে আমি দেখতে পাই আমার ঝাঁকড়া চুলের বন্ধুর হাতে বোরহানির গ্লাস। সেই অর্ধ সমাপ্ত বোরহানির গ্লাসের এক প্রান্তে গোলাপি লিপস্টিকের দাগ। বন্ধু সাদা পাঞ্জাবীর কলারেও সেই গোলাপ রঙের দাগ লেগে আছে। তার চেহারাটাও বেশ খুশি খুশি লাগছে। সেদিন সন্ধ্যা ওদের নাচটা সবচেয়ে সুন্দর হয়। আমার হলুদ সন্ধ্যা অথচ সুন্দর লাগে ওদের। আমি চোখ ফিরিয়ে নেই।   

বিয়ের পর পর আমরা অনেকগুলো দাওয়াত পাই। সপ্তাহের রবি থেকে বৃহস্পতি অফিসের কাজের চাপ আর ছুটির দিনগুলোতে আত্মীয়দের দাওয়াত আমাদের সময়গুলো কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধতে থাকে মাকড়শার জালের মতো। এত মানুষ, এত খাবার, এত আনুষ্ঠানিকতা দেখে আমার খুব বিরক্ত লাগে। মনে হয় নিজেকে আমি চিনতে পারছি না। পেছনে ফেলে এসেছি আমার অর্ধেক আকাশ। প্রকৃত জীবন। একরাতে মেঘের ভারে নুয়ে পড়ে রাতের তারাগুলো। বাঁকা চাঁদ নেমে আসে নাগরদোলার মতো। আমার জীবনসঙ্গী অস্পষ্ট অন্ধকারে আমাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে থাকে। খুব ঘুম ঘুম লাগে আমার। বিরক্তিতে ছ্যাঁত করে ওঠে ভেতরটুকু। আমি এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দেই। সে নিশ্চুপ হয়ে যায় সাথে সাথেই। বিস্ময়ে নাকি ক্রোধে আমি ভাবতে চাই না। ঘুমে ঢলে পড়ি নিশ্চিন্তে। আরামে। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সে বসে আছে জানালার পাশের চেয়ারে। নির্ঘুম। বাইরে সকাল নেমে এসেছে নিঃশব্দে। আমার মনে হয় তাকে একটু জড়িয়ে ধরি। তারপর ভাবি, এটা ভালোবাসা থেকে নয়। বরং গতরাতের ঘটনার পর হয়ত করুণা থেকে এই অনুভূতি কাজ করছে। ভালোবাসাকে প্রশ্রয় দেওয়া যায়। করুণা কে কি যায়?

আমার ঝাঁকড়া চুলের বন্ধু আর গালে তিল থাকা বান্ধবী একসাথে ঘুরে বেড়ায় শহরময়। অনেকেই তাদের কে দেখে ভিন্ন ভিন্ন রেস্তরাঁয়, পার্কে, শপিং মলে। আমি শুনতে পাই। বান্ধবীর বেশ সুন্দর সুন্দর কিছু ছবি আসতে থাকে ফেসবুকে। নানা জায়গার চেক ইন। আমি ভাবি এবার কি তবে ওরা ঘর বাঁধবে? আমার ভেবে অবাক লাগে ওদের কেন জীবন নিয়ে ক্লান্ত লাগে না? কিন্তু মাস কয়েক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কোন খবর আসে না। আমি বুঝতে পারি ওরা হাওয়ায় ভাসছে। বুদবুদের মত। হিলিয়ামে ভরা বেলুনের মতো।

এদিকে হঠাৎ করেই প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হই আমি। জীবন সঙ্গী রাতভর জেগে থাকে পাশে। ছেলেমানুষের মতো উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে। আমি কিছুটা অপরাধবোধে ভুগি। একটা সবুজ বেদনা তাড়া করে বেড়ায় আমাকে। নিজেকে খুব দূর্বল মনে হয়। অন্যকে খুশি করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যক্তিজীবনে আফসোস করার চেয়ে বিচিত্র কিছু আর হয় না। কেন বিয়ে করলাম যখন ইচ্ছে ছিল না? কেন আমরা উদ্দেশ্যহীনতায় ভুগলে ভাবি অন্য কাউকে জীবনে জড়ালেই ভালো থাকব! আমি মোটামুটি সুস্থ হবার পর এক বিকেলে গালে তিল থাকা বান্ধবীর বিয়ের কার্ড পেলাম। ভাবলাম হয়ত আমার বন্ধুর নাম দেখব। অথচ কার্ড খুলে দেখি সেখানে আরেকজনের নাম! সেদিন রাতে বহুদিন পর বন্ধু আমার সাথে উদ্ভ্রান্তের মতো দেখা করতে আসে। আমি দেখতে পাই তার গাল ভর্তি দাঁড়ি আর কোটরে চলে যাওয়া চোখ। সিগারেটের প্রভাবে কালো হয়ে গেছে পুরু ঠোঁটকণ্ঠনালি এমন করে ফুলে ফুলে উঠছে যেন এখনই ভেঙে পড়বে। আমাকে দেখেই বন্ধু কান্নায় ভেঙে পড়ে। জীবনসঙ্গী এই দৃশ্য দেখে কী যেন ভাবে তারপর বলে, ‘তোমরা কথা বলো।’ সে চলে যায়। আমি দেখতে পাই সাথে সাথেই বন্ধু কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ছে। শিশুদের মতো একগুঁয়ে স্বরে সে আমাকে বলে, ‘এই বিয়ে ঠেকাতেই হবে।’

আমি সাথে সাথে বলি, ‘আলবৎ।’ কিন্তু বিয়ে ঠেকানোর জন্য আমি কিছুই করি না। বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যায়। ওদের হানিমুনের ছবিতে আমাদের অনেকের ফেসবুক ভেসে যায়। আমি বন্ধুর খবর নিব নিব করেও নিতে পারি না। কয়েকমাস পর বন্ধু একদিন ফোন করে বলে, ‘শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, বুঝেছিস। আর ফিরব না।’

আমি বলি, ‘আচ্ছা।’ সে শহর ছেড়ে যাওয়ার সপ্তাহ দুই পরেই জানতে পারি বান্ধবীও চলে গেছে কোথাও। কেউ জানে না কোথায়। তার নতুন স্বামী খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে তন্ন তন্ন করে। সবখানে।

আমি কল্পনা করে নেই, ঝাঁকড়া চুলের বন্ধুটির সাথে দূরে, বহু দূরে কোথাও তিল থাকা বান্ধবীর দেখা হয়েছে। কিংবা বন্ধুটি খুঁজে পেয়েছে আবার নতুন কাউকে। যে তাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। হয়ত বান্ধবীটিও নিজের মনের মতো ঠিকানা পেয়ে গিয়েছে। হতে পারে তা অন্য কেউ, হতে পারে তা অন্য কিছু। সত্যি বলতে কি তাদের মিলন হলো নাকি হলো না, তাতে সম্ভবত আমাদের কারোই কিছু যায় আসে না।

কারণ, শেষ পর্যন্ত আমরা সম্ভবত কাউকে মনে রাখি না। আমাদের সবার গল্পগুলোই আসলে ভুলে থাকার গল্প।


মাহরীন ফেরদৌস

তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল কথাসাহিত্যিক। শুরুতে নিজের নামকে আড়াল করে ‘একুয়া রেজিয়া’ নামে লিখতেন গল্প, উপন্যাস। পেয়েছেন পাঠকপ্রিয়তা। যদিও এখন লিখছেন স্বনামে। বর্তমানে আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাসে।

২০১৮ সালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘গল্পগুলো বাড়ি গেছে’ হয়েছিল বেস্ট সেলার। এবারের বইমেলায় আসছে তার সপ্তম বই ‘কাচবন্দি সিম্ফনি’। বইটিতে রয়েছে ১০টি ভিন্নধারার গল্প।

বইটি সম্পর্কে লেখক বলেন, ‘বন্ধ জানালায় বাধা পেয়ে দেয়ালের আড়ালে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর কাছে ছুটে যেতে চায় অসংখ্য গল্প, কখনো না তৈরি হওয়া কোনো সিম্ফনির মতো… কাচবন্দি সিম্ফনি…’

মাহরীন ফেরদৌসের প্রকাশিত বইসমুহ


কমেন্ট করে জানান কেমন লেগেছে- 

মাহরীন ফেরদৌসের গল্প?


আরও গল্প পড়ুন:

মুখোশমানুষ: আশরাফ জুয়েলের ছোটগল্প

ছোটগল্প: জোয়ার-ভাটা | পিন্টু রহমান

দাগ | মেহেরুন নেছা রুমার গল্প

প্রেমগুলো নদী হয়ে যায় | সাইফুল্লাহ সাইফ

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *