শিশুতোষ চলচ্চিত্র 'পাহুনা'

নেপালী শিশুতোষ চলচ্চিত্র পাহুনা: ভীষণ মিষ্টি দুটি শিশুর হাসিকান্নার গল্প

শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘পাহুনা’ এবং কিছু অন্য প্রসঙ্গ


পৃথিবীটাকে পুরোদস্তুর শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার স্বপ্নীল আকাঙ্খা ছিল সুকান্ত কবির। একদল মানুষের স্বার্থপরতা, নিরীহ জনতার জীবন নাশ করে হলেও ক্ষমতার লড়াইয়ে জিতে যাবার উদগ্র ইচ্ছার দাপটে সে স্বপ্ন অধরাই থেকে গেলো! শুভ ইচ্ছেরা বার বার ভেসে যায় অলকানন্দা জলে। আজও কোনো পরাধীন কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শিশুর সুতীব্র চিৎকারে কান পাতলে হয়ত শোনা যাবে তার ক্ষোভাক্রান্ত  ব্যথা-

 

অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি

জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশ ভূমি

অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন।

অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন…

 

এমন ভয়াবহ উপলদ্ধি তো শিশুর মনোজগতের ভাবনা হবার কথা না। অথচ এমনটা পৃথিবীর নানা প্রান্তের অনেক শিশুর ক্ষেত্রে বাস্তবতা। শিশু মনে প্রজাপতির বর্ণিল ডানা পাওয়ার কৌতূহলী জিজ্ঞাসা মুছে দিয়ে, সেখানে গুঁজে দেয়া হচ্ছে বীভৎস দৃশ্য দর্শনের নিষ্ঠুরতা। প্রায়শই তাদের এমন পরিস্হিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়, যার জন্য শিশু মন মোটেও তৈরি থাকে না। বড়দের খেয়াল খুশির মাশুল শিশুদের ভোগ করতে হয় সবচে’ বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমূহ সরিয়ে রেখে, মানুষের সৃষ্টি যে কোন যুদ্ধ-বিবাদের খতিয়ান ঘাটলে এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়ার কথা।


পাহাড় ঘেরা সবুজে ভরপুর আপাত শান্ত সুবোধ এক গ্রামের আকাশে হঠাৎ দেখা যায় কালো ধোঁয়া পাকিয়ে ওঠা, গোলাগুলির শব্দ আর আতঙ্ক নিয়ে লোকজনের ছুটোছুটি। এক পরিবারের সদস্যদের দেখা যায়, যে যার মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ত্রস্ত হাতে গোছাগুছি সেরে নিচ্ছে। দ্রুত পালিয়ে যাবার তাড়া তাদের অবয়বে। বুঝে নিতে কষ্ট হয় না, সময়টা বড় সুখের নয়। বড়দের তৈরি যুদ্ধের দামামা গোটা পরিবেশ জুড়ে। এমন একটা যুদ্ধ পরিস্থিতির দৃশ্যায়ন দিয়ে শুরু হয় ‘Pahuna: The Little Visitors’  সিনেমার গল্পের উড়ান।

সাজানো ঘরবাড়ি ফেলে পালিয়ে যাবার মুখে পরিবারে ছেলেটি দেয়ালে সাঁটা প্রিয় ফুটবল তারকার পোস্টারটি খুলে নিতে চায় সযত্নে। বাবা তাকে তাড়া দেন, হাতে একদম সময় নেই। পালাতে হবে। জানা যায় ছেলেটির নাম প্রণয়। মন খারাপের সামান্য আভাস প্রণয়ের চোখমুখে ফুটে ওঠে কী ওঠে না… প্রাণের তাগিদে আপন পরিবেশ, প্রিয় জিনিসের মায়া পেছনে রেখে ছুটতে শুরু করে পরিবারের সবার সাথে। পালাচ্ছে গ্রামের আরো অনেকেই। ফসলের মাঠ পেরিয়ে নিরাপদ কোনো গন্তব্যে।

পলায়নপর মানুষগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হঠাৎ প্রণয়ের বাবা সিদ্ধান্ত নেন পেছনে ধেয়ে আসা জান্তবদের বিভ্রান্ত করতে তিনি অন্য দিকে ছুটবেন। স্ত্রী মঞ্জুকে ডেকে বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবার অনুরোধ রেখেই ছুট লাগান ফিরতি পথে।

শিশুতোষ চলচ্চিত্র 'পাহুনা'
শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘পাহুনা’

প্রণয়ের বাবা চলে যাবার পরমুহূর্তে গুলির শব্দ শোনা যায়। ‘মা, বাবা!’ বলে মেয়েটি কেঁদে ওঠলে মা সান্ত্বনা দেন, ‘কিচ্ছু হয়নি বাবার’। তিন সন্তান নিয়ে ছুটতে শুরু করেন মা। সেতুর খানিক দূর গিয়ে কোলের ছোট্ট ভাইটিকে মেয়ে অমৃতার কাছে দিয়ে তাকে মায়ের মতো দেখাশোনার কথা বলেন মা। ছেলে প্রণয়কে বলেন এখন থেকে সেই পরিবারের প্রধান। মা-বাবা না ফেরা পর্যন্ত, একে অন্যকে দেখে রাখে যেন। গ্রাম সম্পর্কীয় বোনকে জানান স্বামীর খোঁজ নিতে তিনি গ্রামের দিকে যাচ্ছেন, বাচ্চাদের দায়িত্ব তাকেই দিয়ে গেলেন।

মা আর সন্তানদের কান্নাভেজা বিদায় দৃশ্য, ভর ভরন্ত পরিবারের মুহূর্তে উদ্বাস্তু বনে যাওয়া, সেতু-পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে থাকা শরণার্থীদের দীর্ঘ সারি… ছোটো দুই শিশুর কাঁধে হঠাৎই গুরু দায়িত্বের ভার চেপে বসা, এমন পরিস্হিতি দর্শক মনকে আবেগ তাড়িত করবে, ব্যথিত মনের কুয়াশা ভেঙে ক্ষোভ এসে সামনে দাঁড়াতে চাইবে।

কিসের স্বার্থে, কেন এই অহেতুক যুদ্ধ ইত্যাদির সাল তারিখের স্পষ্ট সুলুকসন্ধান ‘পাহুনা’তে জানানো হয় না। বুঝে নিতে হয় নেপালের এক গ্রাম থেকে হঠাৎই উদ্বাস্তু হয়ে পড়া প্রণয়, অমৃতা, তাদের দুধের শিশু ভাই বিশালকে নিয়ে গ্রামবাসীর সাথে পাহাড়ি পথ ডিঙিয়ে, ভারত সীমান্তের সিকিমে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।


Pahuna: The Little Visitors Trailer



‘পাহুনা’র গল্প গোলাগুলির আতঙ্ক দিয়ে শুরু হলেও, গল্পের প্রেক্ষাপট যুদ্ধ না। বরং সে কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক পরিবারের ছোটো দুই ভাইবোনের কাঁধে হঠাৎ চেপে বসা দায়িত্ব তারা কীভাবে সামাল দেয়, সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার গল্পটা সযত্নে দর্শককে জানানো।

অমৃতা আর প্রণয়ের এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর গল্প কী আমাদের মনে করিয়ে দেবে বিখ্যাত গ্রিম ভাইদের গল্পগাঁথার হ্যানসেল আর গ্রেটেলের কথা? করাতে পারে। অসম্ভব না খুব একটা। কারণ সে গল্পেও তো ছোটো দুই ভাইবোনকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হয়। যদিও হ্যানসেল আর গ্রেটেলের গল্পে যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যাপার ছিল না। হ্যানসেল গ্রেটেলের গল্পে বিমাতার কূটবুদ্ধির সাথে অভাবের তাড়না জড়িত ছিল। অবশ্যই সে বৈরিতা বড়দেরই তৈরি। সেই জটিল আবর্ত থেকে হাঁচড়ে পাঁচড়ে শিশু দুটির জীবনের বাঁকে ফেরা।


‘পাহুনা’তেও অমৃতা আর প্রণয়কে তাদের শিশু ভাইটিকে নিয়ে বড়দের তৈরি ভুলভুলাইয়াতে ঘুরপাক খেতে দেখা যায়। গল্পের প্রথম অংশে উদ্ভূত বৈরি আচরণের থাবা কেটে পালিয়ে আসা অমৃতা, প্রণয় আর বিশালকে নতুন করে পড়তে দেখা যায় একজন পরিণত বয়ষ্ক মানুষের অপরিণত গালগোপ্পোর ঘেরাটোপে।

ঘুমন্ত বোন অমৃতা গ্রাম সম্পর্কীয় চাচার আষাঢ়ে গল্প না শুনলেও ভাই প্রণয় শুনে ফেলে। সদ্যই দেশ ছাড়া, মা-বাবা বিচ্ছিন্ন শিশুর পক্ষে আশ্রয়ের খোঁজে চলতে থাকা বড়দের মুখে শোনা কথোপকথনের সত্যিমিথ্যা যাচাইয়ের পরিপক্ক মন কোথায়? যেখানে বড়রাই সে গল্পে বেশ আস্হাশীল!


গির্জা এবং গির্জার পাদ্রী সম্পর্কিত ভিত্তিহীন সে গল্প বিশ্বাস করে বসে প্রণয়। বোনকেও তা বিশ্বাস করাতে সময় লাগে না। মাকে দেয়া কথা রক্ষার তাগিদে, শিশু ভাইটিসহ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গ্রামবাসীদের থেকে আলাদা হয়ে যায় তারা। শুরু হয় তাদের দ্বিতীয়বার বিচ্ছিন্ন হওয়ার গল্প। অমৃতা, প্রণয়, বিশাল তাদের মা বাবাকে ফিরে পেয়েছিল কিনা, গির্জা বা পাদ্রীর কাহিনিই বা কী? সেসব গল্পে একদমই যাচ্ছি না। জানতে হলে দেখতে হবে পরিচালক পাখি এ.টাইরেওয়ালা( Paakhi A. Tyrewala)র ‘পাহুনা: দ্য লিটল ভিজিটর্স’।

শিশুতোষ চলচ্চিত্র 'পাহুনা'
শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘পাহুনা’

পৃথিবীতে এখনও খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি বলেই হয়ত অমৃতা প্রণয়কে তাদের ছোট্ট ভাইটিকে নিয়ে খুব বেশি বিপদে পড়তে হয় না। পরিস্হিতি শিশুদেরও কেমন দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে ‘পাহুনা’ তার চমৎকার একটা উদাহরণ হতে পারে। তবে সব শিশুর ভাগ্য অমৃতা-প্রণয়ের মতো মসৃণ হয় না। হলে পৃথিবীটা সত্যি আনন্দলোক হয়ে ওঠতো।


বছর খানেক আগে ‘বিস্ট অফ নো নেশন’ নামে একটি সিনেমা দেখেছিলাম। যদিও সেটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র ছিল না। তবে শিশুদের নিবিড় সংশ্লিষ্টতা ছিল তাতে। আফ্রিকান এক নাম না জানা দেশে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আর মানুষের প্রতি মানুষের কী ভীষণ নিষ্ঠুর অবহেলার চালচিত্র সেটি, কী বলবো!

বিস্ট অফ নো নেশনে দেখানো হয়, হাসিখুশি হল্লোড়বাজ ‘আগু’ নামের ছোটো এক ছেলের শৈশব লুট করে নেয় যুদ্ধ। তার ভাই-বোন মা-বাবা দাদু নিয়ে ভরা সংসার তছনছ করে, তার হাতে যুদ্ধবাজ এক গোষ্ঠী নির্বিকারেই তুলে দেয় মরণাস্ত্র। তাকে চোখ মেলে দেখতে বাধ্য করা হয় বয়সের তুলনায় সহ্য ক্ষমতার বাইরের ভয়াবহ ঘটনাসমূহ। অতটা মানসিক চাপ সইতে না পেরে আগু’র মানসিক বৈকল্য দেখা দিয়েছিল একটা সময়।

যে শিশুকে যুদ্ধের নামে দেখতে হয় মায়ের ধর্ষণ দৃশ্য, মেটাতে হয় দলপতির বিকৃত যৌনলালসা, যুক্ত হতে হয় কীটপতঙ্গের মতো মানুষ হত্যার নারকীয়তায়, তার পক্ষে কতটা সহ্য করা সম্ভব! ভালোর আয়ত্তে মন্দের টুঁটি আসতে আসতে শিশুর ভেতর বাড়ির ওলট-পালট তো কম হয়না! বড়দের মতো সহ্য ক্ষমতার অনুবাদ তো শিশুমানস করতে শিখে না।

তাই যুদ্ধ কিংবা বড়দের তৈরি কোনো জটিল আবর্তে শিশুদের মুখোমুখি হওয়া সেলুলয়েডীয় কিছু দেখতে বসলে ভেতরে কেমন ঢিপঢিপ শুরু হয়। ‘ফার্স্ট দে কিল্ড মাই ফাদার’ এর মতো নৃশংস ঘটনানির্ভর সত্যি কাহিনির সিনেমা মনে চাপ সৃষ্টি করে। পাঁচ বছরের মেয়ে লাঙের মতো অভিজ্ঞতায় যেন আর কাউকে পড়তে না হয়, এমন প্রার্থনা জেগে ওঠে। অজান্তেই মন আওড়াতে থাকে সংশ্লিষ্ট বিপদের চেহারা যেন এতটাই নিষ্ঠুর না হয় যা পরবর্তীতে শিশুর মানসিক বিকারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

‘পিহু’ সিনেমার ছোট্ট পিহু’র জন্য বুকের ভেতর হা হা টের পাই। মায়ের নেয়া হটকারী সিদ্ধান্তের জের ছোট্ট পিহুকে কতটা তাড়িয়ে বেড়াবে? কতটা শূন্য হবে তার আগামি জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার! ‘পিহু’ দর্শনে ক্ষুদে কোনো শিশু মনই বা কতটা ব্যথিত হয় জানি না…. সবটা কে কবে জানতে পারে! তেমন কিছু না ঘটুক কায়মনোবাক্যে সেটি চাওয়া।

সিনেমাই তো! বলে পাশ কাটাতে পারা সম্ভব হয় না সব সময়। বাস্তব দুনিয়ায়, আড়ালে আবডালে আরো জঘন্য কত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আতঙ্কের কথা তার অনেক ঘটনায় শিশুদের জড়ানো হয়। সম্পর্কের খোলস ছিঁড়ে আপন পিতা দেখিয়ে দেয় আত্মজাকে তার জান্তব পাশবিকতা!


স্বস্তির কথা ‘পাহুনা’তে এমন কিস্যু নেই। এটি পুরোদস্তুর শিশুতোষ চলচ্চিত্র। শিশুদের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্রে বড়দের কিংবা শক্তিমানের নিষ্ঠুরতার আক্ষরিক উপস্থাপনা কতটা হওয়া বাঞ্ছনীয় তার কোনো নির্দিষ্ট মাপজোক আছে কিনা জানিনা। শিশু মন কতটা নিতে পারে, এই বিবেচনাটুকু সহানুভূতির সাথে নিয়ে সব সময় শিশুতোষ গল্পের চলচ্চিত্রায়নও যে ঘটে না তার দৃষ্টান্ত হয়ত বিগত বছরে তৈরি হওয়া ‘মোগলি দ্য লিজেণ্ড অফ দ্য জঙ্গল’।

Pahuna The Little Visitors
Pahuna The Little Visitors

ছেলেমেয়ে বুড়োবুড়ি সবার প্রিয় ‘দ্য জঙ্গল বুক’এর চরিত্র মোগলির গল্প নিয়ে সিনেমা ‘মোগলি দ্য লিজেণ্ড অফ দ্য জঙ্গল’ দেখতে গিয়ে খানিক হোঁচটই খেতে হয়েছে। সিনেমার কিছুটা দেখেই পাশে বসা পিচ্চিটা প্রায় ফুঁপিয়ে বলেছে, ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ওয়াচ মোগলি, বিকজ ইটস সো ক্রুয়েল!’


শিশুতোষ গল্পের চলচ্চিত্রায়ন এভাবে আড়ালের আব্রু ছিঁড়েখুড়ে, এতটা ডার্ক লেবেলে নেবার খায়েশ কেন দেখালেন পরিচালক অ্যান্ডি স্যারকিস (Andy Serkis), জানিনা। তবে অনেক বড়রাই এটিকে সাদরে গ্রহন করেছেন। নাদান দর্শক হিসেবে আমার পক্ষে এটিকে হাসি মুখে হজম করা সম্ভব হয়নি। নিজের মতো করে এটুকু বুঝেছি, শিশু মনের কোমলতায় হুটহাট বিষের কামড় না বসিয়ে কিছু আড়াল থাকা ভালো। চারপাশে বড়দের অজস্র হিংসাত্মক কার্যকলাপে এমনিতেই ওরা যথেষ্ট কাবু। সেলুলয়ডের সময়টুকুতে নাই বা রাখলাম তার ছাপ। বিশেষ করে এমন প্রিয় বইয়ের ক্ষেত্রে। নাহ্ আমারও তেমন একটা ভালো লাগেনি ‘মোগলি দ্য লিজেণ্ড অফ দ্য জঙ্গল।’ শিশুতোষ কিছু দেখার আনন্দ নিয়ে ডার্ক জাতীয় কিছু দেখে ফেলাটা আনন্দদায়ক না মোটেও।

জানি জীবনের সবটা জুড়েই ফুল, পাখি, গান এমন ভ্রান্ত ধারণার ঘেরাটোপে আজকের শিশুদের রাখবার উপায় নেই। চারপাশে এত রূঢ়তা, এত হানাহানি, আর সেসবের অবাধ প্রচার, যে চাইলেও শিশুকে আগলে রাখা যাবে না। কিন্তু তারপরও মনে করি, চারপাশে কী ঘটছে, কেন ঘটছে, উপযুক্ত সময়ে শিশুই তার সুলুকসন্ধানের স্বাধীনতা নিক। এ প্রসঙ্গে শিশুদের নিয়ে ভাবিত ওয়াল্ট ডিজনির মন্তব্যটি খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না হয়ত। চলুন দেখে নেয়া যাক-

 

“Children are people, and they should have to reach to learn about things, to understand things, just as adults have to reach if they want to grow in mental stature. Life is composed of lights and shadows, and we would be untruthful, insincere, and saccharine if we tried to pretend there were no shadows. Most things are good, and they are the strongest things; but there are evil things too, and you are not doing a child a favor by trying to shield him from reality. The important thing is to teach a child that good can always triumph over evil.”


‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ সিনেমাটি অনেক কারণেই আজীবনের জন্য অসম্ভব প্রিয়’র তালিকায় থাকবে। তার মধ্যে একটি কারণ হলো, অবুঝ সন্তান জিওস্যুর কাছ থেকে বাবা গুইডো ওরাফিসের যুদ্ধের বিভৎসতা আড়াল করতে চেয়ে মজার খেলা উদ্ভাবনের প্রাণান্তকর চেষ্টা। বাবার জানাই ছিল পরিণতি, তারপরও শিশুর জন্য প্রাণপণ করে যাওয়া মর্মস্পর্শী, আন্তরিকতায় ভরা চেষ্টাকে অগ্রাহ্য করা যায়? বড়দের নিষ্ঠুরতার সাক্ষী গোপাল হবার দায় থেকে শিশুদের আলগোছে কিছুটা দূরে রাখা গেলে, অন্ধকারের সুরগুলো তাদের কান বাঁচিয়ে রাখলে, পৃথিবী ধ্বংসের মুখোমুখি হবার মতো সংকটে পড়ে না নিশ্চয়ই!


‘পাহুনা’ নামের নেপালী চলচ্চিত্রে সপাটে নিষ্ঠুরতা প্রকাশের উগ্রতা অনুপস্হিত, নেই অন্ধকারের গান জোরপূর্বক শুনিয়ে দেবার জবরদস্তি। যদিও ছোটো ছেলে প্রণয় অন্ধকার ভয় পায়, কিন্তু সেই অন্ধকার নিয়ে অহেতুক গা ছমছমে দৃশ্যের বালাই নেই একদম।

ভীষণ মিষ্টি দুটো ছেলে-মেয়ের সাবলীল হাসিকান্নার উপভোগ্য গল্প ‘পাহুনা’। ‘পাহুনা’ নেপালী ভাষা, যার অর্থ আগন্তুক। এতে খানিকটা রূপকথার স্বাদও পাওয়া যাবে হয়ত। শিশুরা আনন্দের সাথে ক্ষুদে আগন্তুকদের স্বাগত জানাবে এটি নিশ্চিত। কারণ এটা সেই গল্প, শিশুরা যেরকমটা দেখতে- শুনতে ভালোবাসে। “Good can always triumph over evil.” এর অভিজ্ঞতা অর্জনের যাত্রায় অমৃতা, প্রণয়ের শিশু মনকে তেমন একটা বিভৎসতার মুখোমুখি হতে হয় না। এটি স্বস্তিদায়ক। আনন্দেরও!


Pahuna: The Little Visitors

প্রারম্ভিক মুক্তি: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

পরিচালক: পাখী তাইরিওয়ালা
ভাষা: নেপালি
প্রযোজক: প্রিয়াঙ্কা চোপড়া
বিভাগ: শিশুতোষ
Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *