তরুণ ক্রিকেটারদের নৈতিক অবক্ষয়

অশনি সংকেত! বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের নৈতিক সমস্যা

একের পর এক বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের নৈতিক অবক্ষয় বা বিশৃঙ্খলা যাই বলি না কেনো, তা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অশনি সংকেত। এটা স্লো পয়জনিংয়ের মতো কাজ করছে এবং ধীরে ধীরে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। একটার পর একটা মেয়ে ঘটিত স্ক্যান্ডাল ক্রিকেটারদের সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস, ভালোবাসার জায়গাটিতে আঘাত হানছে বারবার! 

একজন মানুষের মানুষ হয়ে উঠতে গেলে তাঁর নৈতিক মূল্যবোধ থাকা জরুরী। নৈতিক অবক্ষয় ব্যাধির মতো। আর সেই ব্যাধি যখন ক্রিকেটের মতো একটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের এই উপমহাদেশে ক্রিকেট খেলাটাকে একটু অন্য চোখে দেখা হয়। যত না পেশা হিসেবে তার চেয়েও বেশি আবেগ দিয়ে বিচার করা হয়। তাই এখানে যেকোন দলের ক্রিকেটারকে সবসময়ই তটস্থ থাকতে হয় স্পর্শকাতর ব্যপারগুলোতে। কেননা এই অঞ্চলে খেলোয়াড়দেরকে দেখা হয় নায়ক হিসেবে, আদর্শ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে। 

তাঁদের হতে হয় সবচেয়ে পরিষ্কার চরিত্রের মানুষ। কেননা শত কোটি মানুষ তাদেরকে নিয়ে আবেগ প্রকাশ করে, তাদের নিয়ে স্বপ্নজাল গাঁথে। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখতে পারি শচীন টেন্ডুলকারকে।

এই মুহূর্তের সবচেয়ে সেরা ক্রিকেটার বিরাট কোহলি তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি শচীন কে নায়ক মনে করে বড় হয়েছেন, শচীনের মাঠের ভিতর এবং বাইরের আচরণ ছিলো বিরাটের কাছে উদাহরণ।

প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ কবীর চৌধুরী বলেন- “নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষের চরিত্র বলতে কিছুই থাকে না।” 

এতো গেলো সর্বকালের সেরা নায়কের কথা। এই উপমহাদেশে আপনি খেলোয়াড় হিসেবে ভালো কাজ করলে যতোটা না আপনাকে ধন্য ধন্য করবে, তেমনি আপনি একটা বিতর্কিত কাজ করলে আপনাকে ছুড়ে ফেলতে বেশিক্ষণ লাগবে না। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের ক্ষেত্রে কি হয়েছিলো নিশ্চয় আপনার মনে আছে। 

বাংলাদেশ ক্রিকেটপ্রেমী এই উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি আবেগপ্রবণ দেশ। রাজনৈতিকভাবে এবং সীমানা দিয়ে বিভক্ত হলেও, সবারই ক্রিকেট সম্পর্কে আবেগ সমান। বাংলাদেশে এরকম অনুপ্রেরণার অভাব নেই। আশরাফুলকে নিজেদের প্রথম “হিরো” মনে করে এরকম ১০ জনকে যদি জিজ্ঞেস করেন, দেখবেন ৬ থেকে ৭ জনই স্বীকার করবেন১০ জনে ১০ জনই আশরাফুলকে তাদের আদর্শ মনে করতেন, যদি আশরাফুল ফিক্সিংয়ে না জড়াতেন।

মোদ্দা কথা হলো, এই বাংলাদেশে খেলোয়াড়দের দেখা হয় অনুপ্রেরণা হিসেবে, আদর্শ হিসেবে যার প্রমাণ হলো সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিক কিংবা মাহমুদউল্লাহ্‌।

তরুণ ক্রিকেটারদের নৈতিক অবক্ষয়
বাংলাদেশ ক্রিকেটের পাঁচ কাণ্ডারি

জাতীয় দলের প্রতিটি খেলোয়াড় বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ কিংবা বাচ্চাদের জন্য একটি আদর্শস্বরূপ। কিন্তু যখন এই আদর্শরা বিতর্কিত হয়, তখন ঠিক কি বার্তা যায় তরুণদের কাছে?

২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ খুব সাহসী ক্রিকেট খেলা শুরু করেছে। এবং তার ফলও পাচ্ছে। ওয়ানডে ফরম্যাটে এখন বিশ্বের যেকোনো দলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারে বাংলাদেশ। দুই বছর পর অর্থাৎ ২০১৭ থেকে গত এক বছর ধরে বাংলাদেশের তরুন ক্রিকেটাররা ভয়াবহ ভাবে ব্যর্থ।

এক মুস্তাফিজ, মিরাজ ছাড়া কোনো তরুণই দলে জায়গা পাকা করতে পারছেন না এবং তাদের ফর্মও তাদের পক্ষে থাকছে না।

এরই মধ্যে বিভিন্ন তরুণ ক্রিকেটার জড়িয়ে পড়েছেন বিতর্কিত নারী ইস্যুগুলোতে।

তরুণ বয়সের ভুলকে শোধরাতে দরকার আত্মশুদ্ধির মনোভাব, যা আমাদের ক্রিকেটাররা খুব তাড়াতাড়ি করতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস রাখি।

অসাধারণ মারকুটে ব্যাটসম্যান এবং অসাধারণ ফিল্ডার হিসেবে জাতীয় দলে প্রবেশ করেছিলেন সাব্বির রহমান। প্রথম দুই বছর ফর্ম ভালো ছিল, তবে তাঁর মাঠের বাইরের পারফরম্যান্স কখনোই ভালো ছিলো না। ২০১৪ সালে সানিয়া মির্জাকে উত্যক্ত, “ম্যাও” কান্ড, ড্রাইভার পেটানো কিংবা সফরে থাকাকালীন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যানদের গালি দেওয়া। তাঁর বিতর্কের অভাব নেই।

নাসির ঢুকেছিলেন দলে একজন “পারফেক্ট” ফিনিশার হিসেবে। কিন্তু হাতুড়েসিংহে থাকাকালীন প্র্যাক্টিস করতে না চাওয়া, কিংবা ৮০টা গার্লফ্রেন্ড তো অনেক পুরোনো খবর! এছাড়া নাসিরের এক উঠতি মডেলের সাথে সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের কেচ্ছা-কাহিনী তো সবাই জানে সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে। এসবের পরিণামে বাদ পড়েছেন দল থেকে অনেক দিন ধরেই।

মোসাদ্দেকও দলে ঢুকেছিলেন এদের পজিশনেই। ব্যাটিং অল-রাউন্ডার যে ভালো হাত ঘুরাতেও পারেকিন্তু তিনি হাত ঘুরালেন তার বখে যাওয়া পূর্বসূরিদের মতো। পারিবারিক আদালতে মামলা, দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ। হঠাত করেই মোসাদ্দেকের ক্যারিয়ার যেন ঝুলতে শুরু করলো খাঁড়ার উপর।

 

তরুণ ক্রিকেটারদের নৈতিক অবক্ষয়
তরুণ ক্রিকেটার

রুবেলের “হ্যাপি” কান্ড, শহীদের দ্বিতীয় বিয়ে, শাহাদাতের কাজের মেয়ে পেটানো, আরাফাত সানির সাইবার ক্রাইমের অপরাধী হওয়া। তার স্ত্রীর নগ্ন ছবি ছড়িয়ে কিংবা আল-আমিনের টিম হোটেলে দেরিতে ফিরে আসা সফরে গিয়ে। বাংলাদেশের এই  খেলোয়াড়রা, যারা সবাই হতে পারত তরুণদের সামনে উদাহরণ, তারা বেছে নিলেন বিতর্কের অন্ধকার পথ।

ক্রিকেট দুনিয়ায় এরকম অনেক নারী-ঘটিত বিতর্ক রয়েছে ক্রিকেটারদের। শহীদ আফ্রিদী, ক্রিস গেইল, কেভিন পিটারসেন, শেন ওয়ার্ন এরা সবাই ক্যারিয়ারে এরকম বিতর্কে পড়েছেন। কিন্তু তাঁরা সেই ব্যাপারটাকে কখনোই মাঠে আসতে দেননি। পারফর্ম করেছেন। দলকে জিতিয়েছেন। যে কারণে নীতিনির্ধারকরাও তাঁদের দল থেকে বাদ দেননি।

এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা – পড়তে ক্লিক করুন

এমনও কথা শোনা যায় যে, শেন আগের রাত বারে কাটিয়ে পরের দিন টেস্টে পাঁচ উইকেট নিয়েছেনএজন্য তাঁরা কিছুক্ষণের জন্য সমালোচিত হলেও এখন মাঠের পারফরম্যান্সের কারণে কিংবদন্তি। কিন্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার যখন মাঠে চলে আসে, তখন তা দৃষ্টিকটু হয়ে উঠে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর উপর আমাদের “সোনার” ছেলেদের পারফরম্যান্স তো তথৈবচ।

৫ বলে ৮ রান লাগতো ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, সেই ম্যাচ বের করতে করতে পারেননি মোসাদ্দেক। একের পর এক ব্যর্থতা যেনো সাব্বিরের সমার্থকই হয়ে উঠেছে।

একজন ক্রিকেটার হাজার হাজার উঠতি তরুণের আদর্শ হয়, রোল মডেলে পরিণত হয়

লেখার শুরুতে বলেছিলাম, উপমহাদেশে খেলোয়াড়দের উপর চাপ অন্যরকম। এখানে মানুষ শত কষ্ট, পরিশ্রম করে যখন রাতে খেলা দেখতে বসেন, চিন্তা করেন দল জিতবে। তিনি রাতে ভালোভাবে ঘুমাবেন।

এত দুর্নীতি, অনিয়মের মধ্যে খেলা অনেকের আনন্দের খোরাক। কিন্তু যখন এই খেলোয়াড়রা আমাদের হতাশ করেন, তখন এর প্রতিক্রিয়াই অন্য রকম হয়।

বিশেষ করে, বাংলাদেশের পঞ্চ-পান্ডবের জন্য আমরা এত ম্যাচ জিতেছি যে, তা হয়তো না বললেও চলে। মাঠের বাইরের জীবনেও তাঁরা অনুকরণীয়। কিন্তু তরুণ ক্রিকেটাররা ক্রমাগত আমাদের আশাহত করে যাচ্ছেন। মাঠের বাইরে উশৃঙ্খল জীবন-যাপন, মাঠে ক্রমাগত ব্যর্থতা যেনো তাদের স্বভাবই হয়ে গেছে।  

  

তরুণ ক্রিকেটারদের নৈতিক অবক্ষয়
সম্ভাবনাময় তরুণ ক্রিকেটার 

এই তরুণ ক্রিকেটারদের বেশিরভাগই দলে ঢুকেছিলেন অপার সম্ভাবনা নিয়ে। সাব্বির, নাসিরের মধ্যে তো বাংলাদেশের অনেকদিনের কাঙ্ক্ষিত ফিনিশার খুজে পেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু নিজেদের খ্যাতির ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়ার কারণে, সেই সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ভালো করে শুরু করার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

একজন ক্রিকেটার হাজার হাজার উঠতি তরুণের আদর্শ হয়, রোল মডেলে পরিণত হয়। কিন্তু সাব্বির, নাসিরদের এহেন কর্মকাণ্ড কি ভবিষ্যত ক্রিকেটারদের ভালো বার্তা দেয়?

কিছুদিন আগে এক প্রেস কনফারেন্সে বিসিবি সভাপতি বলেন, তাঁরা একটা মনোবিদ নিয়োগ করবেন ক্রিকেটারদের জন্য, যা আরো আগেই করা উচিত ছিল। শুধু শাস্তি এবং জরিমানা দিলে হবে না, লাগবে সঠিক কাউন্সেলিং।

তাদের বুঝাতে হবে, কেনো তাদের একটি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে এদেশের মানুষদের প্রতি। খ্যাতির ভেলায় নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত তা বোঝাতে দরকার একজন মনোবিজ্ঞানী। এই তরুণ বয়সের ভুলকে শোধরাতে দরকার আত্মশুদ্ধি, যা এই ক্রিকেটাররা খুব তাড়াতাড়ি করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। 

এগিয়ে যাক বাংলাদেশ, এগিয়ে যাক বাংলাদেশ ক্রিকেট। 

 

Share this

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *