ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাড়ানোর জন্য যে ১০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন

ব্যর্থতা বনাম সাফল্য 

“সিদ্ধান্ত” নামক অধ্যায়টি আমাদের জীবনের সাথে খুব নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। এই বিষয়টির উপর আমাদের অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের  দিনগুলোর ধরণ নির্ভর করে। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অতীতের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ভুগতে থাকি।

সফলতা তখন সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ জীবনের সফলতা, ব্যর্থতার সিংহভাগ নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই জীবনে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি।   

কিন্তু ৮৫% মানুষ জানেই না কিভাবে তা নিতে হয়। সকালের ফরমাল ড্রেস থেকে রাতের টুথপেস্ট- সব ব্যাপারেই মানুষ দোটানায় ভোগে।  এই দোটানা থেকেই শুরু হয় হতাশা।

ফলে জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত জীবনের সবকিছুকে নষ্ট করে দিতে পারে। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। ক্যারিয়ার, পরিবার, প্রেম-ভালোবাসা, বন্ধুত্ব সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব নিজের।

 

ব্যর্থতা থেকে সাফল্য

আপনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন কি ? 

চাকরী ছেড়ে দিয়ে কি নিজেই ব্যবসা শুরু করব?

লাল জামাটা বেশি সুন্দর নাকি নীলটা?

গার্লফ্রেন্ডের সাথে কি ব্রেকাপ করে দিবো?

এমন আরো অনেক বিষয় নিয়ে আমরা দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে পড়ে যাই। মূল পর্ব শুরু করার আগে আপনার কাছে প্রশ্ন হল, কোন বিষয়টি নিয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যান? আপনার মতামত কমেন্টে বক্সে লিখে জানান আমাদের। 

 

ব্যর্থতা থেকে সাফল্য

সিদ্ধান্ত নিন জড়ালো ভাবে 

ঘুরে দাড়ানোর প্রত্যয়ী সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে এমন কিছু বিষয়ের সাথে আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিবো।

১. লক্ষ্য নির্ধারণ করা

কোনো কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে সাধারণত যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় তা হলো, নিজের জন্য সঠিক কোনটি। যেমন ধরুন- ৯৫% মেয়েরা যে ব্যাপারটা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায়  ভুগে, সেটা হলো পরিবারের কথায় বিয়ের পর পড়াশোনা করব, নাকি আগে ক্যারিয়ারটা গুছিয়ে নিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসব?

এখন প্রশ্ন হলো, আপনি দশ বছর পর নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান, সেই সিদ্ধান্তটা নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। যদিও দুই দিকেই সফলতা লুকিয়ে রয়েছে, কিন্তু সেটা পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনাকেই নির্ধারণ করতে হবে।

২. নিজের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া

এক রিসার্চ বলছে – ‘যেসব মানুষ নিজের চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে না, তারা বেশিরভাগ সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। ‘যেমন ধরুন – ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় আমরা নিজের সিদ্ধান্তের চাইতে পরিবারের সিদ্ধান্ত দ্বারা বেশি প্রভাবিত হই।

যার জন্য পরবর্তীতে টাকা-পয়সার সাগরে ভেসেও সেই নির্মল আনন্দটা খুঁজে পাই না। মনে হয় কি যেন নেই, কি যেন নেই। বাবা-মা যদিও আমাদের ক্ষতি চান না, তবুও ছেলেমেয়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়টা অনেকেই গুরুত্বের সাথে নেন না। এ

টা মনে রাখা জরুরী নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থাকলে পরবর্তীতে কাজে ব্যর্থ হলেও নিজেকে স্বান্তনা দেওয়া সহজ হবে।

ব্যর্থতার সাগর পাড়ি দিয়ে পৃথিবী সেরা ওয়াল্ট ডিজনি | পড়তে ক্লিক করুন

৩. নিজের যোগ্যতার উপর আত্মবিশ্বাস

বলা হয়ে থাকে- ‘আপনি নিজে যদি নিজের ক্যারিয়ারের স্বপ্ন নিয়ে ভয় না পান, তাইলে সেটা আপনার যোগ্য  নয়।’ কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের সমস্যা হলো, তারা হতাশায় ভোগে। আমি কি পারব? আমার দ্বারা কি হবে?

এই চক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নিজেই নিজের উৎসাহদাতা হতে হবে। এরপরও কেউ যদি আপনাকে থামানোর চেষ্টা করে, বা অনুৎসাহিত করে, ভাবতে হবে তার ক্ষমতার সীমা কম।

উৎসাহ বাড়ানোর জন্য মহান ব্যাক্তিদের জীবনী, তাদের সংগ্রামের গল্প সম্পর্কে জানুন। দেখবেন আপনার সাহসের পারদ তড়তড় করে বাড়তে থাকবে।

৪. জ্ঞানীজনের উপদেশ গ্রহণ

মানুষ যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে তখন তারা যে কাজটা করে, সেটা হলো তার আশেপাশের এমন মানুষদের থেকে সিদ্ধান্ত নেয়, যাদের হয়ত সেই ব্যাপারে কোনো প্রকার ধারণাই নাই।

একটা ভুল সিদ্ধান্ত নষ্ট করে দিতে পারে আপনার সোনালী ভবিষ্যৎ।  তার মানে এই নয় যে, আপনি অন্যের পরামর্শ /উপদেশ গ্রহণ করবেন না। এক্ষেত্রে সমাধান হলো, এমন মানুষদেরকে বাছাই করুন যারা আপনার মতই সমস্যায় ভুক্তভোগী ছিল। ব

র্তমানের সেরা সফল ব্যাক্তিদের কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতার কথাগুলো অনুসরণ করতে পারেন। আপনি অন্যের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে নিজের সিদ্ধান্তে নতুনত্ব আনতেই পারেন, তবে পুরোপুরি ভাবে কখনোই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।

 

ব্যর্থতা থেকে সাফল্য

৫. সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ

অনেক সফল ব্যাক্তির মুখে শোনা যায় তাঁরা বাথরুমে বসে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা শুনে আপনি হয়ত ভাবছেন দিনের বেশিরভাগটা সময়টা বাথরুমে কাটানো উচিত।

ভুল; প্রত্যেকেরই নিজস্বতা আছে। কেননা, প্রত্যেকটা মানুষেরই চিন্তা-ভাবনা আলাদা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সময়, পরিবেশ, মেজাজ অনেকাংশে নির্ভর করে।

টানা দুইঘন্টা ধরে জ্যামে বসে নেওয়া সিদ্ধান্ত আপনার কল্যাণ ডেকে আনবে না, কিংবা অফিসে বসের ঝারি খাওয়ার পরবর্তী মূহুর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তও হতে পারে আপনার জন্য ক্ষতিকারক।

তাই এমন একটা সময় বেছে নিন, যখন আপনার মেজাজ, পরিবেশ সবই আপনার অনুকূলে থাকে। সেটা হতে পারে সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা সক্কালবেলায়। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ৮০% বেশি।

পড়ালেখায় মন নেই? জেনে নিন মনোযোগ বাড়ানোর ১১টি টিপস

৬.অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করা

আমরা এতটাই অসহায় জীব যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি, যে সিদ্ধান্ত নিলাম সেটা কি সঠিক সিদ্ধান্ত? ভুল করছি না তো?

তবে এর ভালো এবং খারাপ উভয় দিকই রয়েছে। একটা সিদ্ধান্তের উপর অনেককিছুই নির্ভর করে, সেইজন্য প্রতিটা সিদ্ধান্তই ভেবেচিন্তে নেওয়া উচিত। মনে কোনো আশংকা থাকলে সেটা নিয়ে বিচার -বিশ্লেষণ দোষের কিছু নয়।

এক্ষেত্রে দেখা গেল, হয়ত আপনি একটা ভুল সিদ্ধান্ত থেকে নিজের ভবিষ্যৎ কে বাঁচাতে পারলেন। এটা অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার ভালো দিক। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এটা নিয়ে আমরা অতিরিক্ত পরিমাণে চিন্তিত হয়ে পড়ি।

ফলাফল যেটা দাঁড়ায় তা হলো অতিরিক্ত চিন্তা, ভয়ের কারণে  নিজের নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসি।

যেটা একদমই অসহ্যনীয় ব্যাপার। এমনটা হতে পারে যে আপনি অনেক কষ্টে ভেবেচিন্তে একটা সঠিক সিদ্ধান্তই নিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা আপনার পাকা ধানে মই দিয়ে দিল। অতএব এ ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা বাঞ্চনীয়।

 

ব্যর্থতা থেকে সাফল্য

৭. হাসিখুশি থাকা

জীবনে সুখ বেশি নাকি কষ্ট- এই নিয়ে হয়ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে ফেলা সম্ভব, কিন্তু এর উত্তর পাওয়া মুশকিল ব্যাপার।

দুঃখ-কষ্ট, ভালোলাগা, আনন্দ এগুলো সবই যার যার নিজস্ব মনস্ততাত্ত্বিক ভাবনা। এই ধরুন ইদে আপনি নিজের পছন্দ মতো সুন্দর দেখে একটা জামা কিনলেন ; এদিক থেকে কিন্তু আপনি সুখী।

কিন্তু পরে শুনতে পারলেন আপনার বন্ধুটি আপনার থেকে ভালো জামা কিনেছে, তখন অবশ্যই আপনি দুখী ভাববেন নিজেকে।

জীবনে সুখী হওয়ার জন্য কি প্রয়োজন সেটার কোনো মানদন্ড নাই। নিজের যেটুকু আছে সেটুকুর ভিতরেই সুখ খুঁজুন দেখবেন পাবেন।  

অন্যের স্ত্রী/ স্বামী সুন্দর বলে নিজের সঙ্গী/সঙ্গিনীকে নিয়ে অসুখী হবেন না। এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এগুলো আপনাকে হাসিখুশি রাখতে চেষ্টা করবে।

হাসিখুশি থাকলে আপনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিক মনোযোগী হবেন এবং এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা প্রায় ৯০%।

৮. কাজের ঝুকি হিসাব করা

বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি তাদের নতুন প্রজেক্ট শুরু করার আগে লাভ- ক্ষতির একটা অনুমেয় হিসাব কষে নেয় যেটা তাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। কোনো কাজে হাত দেওয়ার আগে একটা হিসাব করে নেওয়া উচিত।

কারণ প্রত্যেক কাজেই ব্যর্থতার একটা সম্ভাবনা থাকে। লাভ-ক্ষতির পরিমাপে আমরা সাধারণত যে ভুলটা করি সেটা হলো ব্যর্থতার অর্থাৎ ঝুঁকির পরিমাণ বাদ দিয়ে হিসাবের অংক করি। আর এ জন্যেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করি।

প্রত্যেক কাজের ক্ষেত্রেই ঝুঁকি থাকে হোক সেটা সীমিত। তাই  যেকোনো কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ঝুঁকির পরিমাণটা মাথায় রাখা উচিত।

৯. নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা

‘মানুষ তার স্বপ্নের চাইতেও বড়’- প্রত্যেকের অধিকার আছে স্বপ্ন দেখার। কিন্তু সেটা অবশ্যই যুক্তিসংগত হওয়া বাঞ্চনীয়। একজন অন্ধ ব্যাক্তির জন্য সার্জারির ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা অবশ্যই ভুল সিদ্ধান্ত।

তাই আগে নিজের দক্ষতার জায়গা সম্পর্কে জানুন, এক্ষেত্রে সুবিধা হলো আপনার সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আপনি সফলতার মুখ দেখতে পারবেন।

কোন কাজে আপনি পারদর্শী সেটা জানা না থাকলে স্থায়ী সাফল্যের মুখ দেখাটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে এগিয়ে চলুন, সেই অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। সফলতা আপনার দরজায় কড়া নাড়বে।

 

ব্যর্থতা থেকে সাফল্য

১০.বিকল্প অপশন হাতে রাখা

মনে করুন কোনো এক অচেনা জায়গায় আপনি ঘুরতে যাচ্ছেন। সেখানকার ভাষার সাথে আপনি পরিচিত নন। স্বজাতি কারো থেকে সেখানে যাওয়ার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করলেন।  

কিন্তু মাঝপথে গিয়ে রাস্তা ভুলে গেলেন। এখন উপায়? আপনি যদি বিকল্প আর একটা রাস্তা সম্পর্কে জেনে রওনা দিতেন, তাহলে বিপাকে পড়া লাগত না।

এমনও হতে পারে, আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেও কোনো কাজে ব্যর্থ হয়েছেন সেক্ষেত্রে পুরোপুরি হতাশ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এর সমাধান হলো বিকল্প সিদ্ধান্ত হাতে রাখা। কেননা ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। ভুলবশত ব্যর্থতা ডেকে আনার বদলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আরেকটা সফলতা আসার আরেকটা রাস্তা খোলা রাখুন।

আমাদের ছোট জীবনের প্রতিটা মূহুর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্যে প্রতিটা মূহুর্ত একেকটি নতুন সুযোগ।

তাই ধৈর্যশীল হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে আমরা সময়ের এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পারি। ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে আদর্শ হিসেবে তৈরী করতে পারি।

আদর্শ হয়ে উঠার এই যাত্রায় অভিযাত্রীর পক্ষ থেকে আপনার জন্যে রইল শুভকামনা। আপনার জীবনের নৈমিত্তিক নানাবিধ সমস্যা গুলো আমাদেরকে কমেন্টে জানান, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব পরবর্তী আলোচনাগুলোতে যৌক্তিক সমাধান দিতে। ধন্যবাদ, আমাদের সাথে থাকার জন্য।

 

কিভাবে সিদ্ধান্ত নিবেন তা জানতে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন 

 

Share this

Leave a Comment