মেহেরুন নেছা রুমার গল্প

মেহেরুন নেছা রুমার গল্প

দাগ | মেহেরুন নেছা রুমার গল্প

মেহেরুন নেছা রুমার গল্প দাগ:

দাগ
মেহেরুন নেছা রুমা


উঠোনের উত্তরপাশের কোমরভাঙা পেয়ারা গাছটির তলায় দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত নয়নে আহত নাগিনের মতো ফোঁসফোঁস করে শিখারাণী। মনের ভেতরের অগ্নিস্ফুলিঙ্গের তাপদাহে নিজের কানের কাছটা গরম হয়ে ওঠে ক্রমশ। বারবার গন্ডির সীমানা ছিন্ন করে উঠোনের মাঝখানটাতে ছুটে গিয়ে চীৎকার করে বলে, এইডা আমি মানি না, আমি কিচ্ছু করি নাই। আমারে মিথ্যা দোষ দিলে কলাম চাইরদিগে আগুন জ্বালাই দিমু। সবার কথা ফাঁস কইরা দিমু।

ঠাস করে গালে এক থাপ্পড় মেরে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়ে দেয় মালতী। হেচকা টানে তাকে পুনরায় গাছের তলায় এনে আছড়ে মাটিতে ফেলে দেয়। মালতির কটকটে চোখের দৃষ্টি শিখারাণীর অন্তর ভেদ করে গলিত লাভা ছিটকে পড়ে সমাজের আঙিনা জুড়ে।
বলি, লাজ-শরমের মাথা খাইছোস? জাত খোয়াইয়া খায়েস মিডে নাই? গলায় দড়ি দিয়া মরতে পারলি না হারামজাদি?

এভাবেই মালতির বাক্যবাণে আহত ভগ্ন হৃদয়ে রক্ত টগবগ করে ওঠে। জবাব দেয়, না মিডে নাই। আমারে এত কতা কওনের তুমি কে? তুমি যে কী করো তা কি আমি জানি না? আমার বিচার করতে হইলে এই বৈটকে তোমারও বিচার করোন লাগবো। বিধবা হইয়া আমার বাপের বইন সাইজা এইবাড়ি আইসা উঠছো, আামি কি কিছু বুঝি না?

পূর্বের তুলনায় আরো জোরে একটা থাপ্পড়ের আঘাতে শিখারাণী তাল সামলাতে না পেরে ধুম করে মাটিতে পড়ে যায়। মাথা তুলতে গিয়ে নিজের জন্মদাতা পিতার নগ্ন পা দুখানি দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, খালি একখান থাপ্পড় কেন্ দিলা বাবা? আরো মারো, এক্কেলে মাইরা ফালাও। তুমি বাপ, তুমি মারলে দোষ নাই। কিন্তু অন্যেরা আমারে কেন্ মারে? নিজের বাপের ঘরে থাকতে পারুম না, নিজের গ্রামে থাকতে পারুম না, আমার বাইচা থাকনের কী দরকার!

বাপের ডান হাতখানি ধরে নিয়ে নিজের গালে একের পর এক থাপ্পড় মেরেই যায়। অনেক চেষ্টা করেও আর দুইচোখের বন্যা আটকে রাখতে পারে না সে। বাপের হাতখানি ছেড়ে দিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে অন্তরজ্বালায় আপন বুক চাপড়াতে থাকে বয়ো:সন্ধিলগ্নের এক মাতৃহারা কিশোরী।

জামাল কাজির বাপ সোহরাব কাজি চেয়ার ছেড়ে উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে যায়। বলে, অর চুলের মুটিটা ধইরা কেউ গোড়াত্তন কাইট্টা দিতে পারোছ না? নাইলে আমার কাছে ধইরা আন, চোপড়াই অর সবগুলিন দাঁত ফালাই দেই। বেদ্দোপ ছেমড়ি কোথাকার! এহন আবার ঢং শুরু কচ্ছে।

সোহরাব কাজির কথায় উঠোন জুড়ে আলোচনা গমগমিয়ে ওঠে। তালে তাল মেলাতে কেউ আর তর সইতে রাজি নয়।

হ, নিয়া আয় ছেমরিরে। এট্টুকুন ছেমরি মুরুব্বিগো মুকে মুকে তক্ক করে। আর একজন বলে, রাইত দুপুরি মোসলমান পোলার লগে এইট্টুক ছেমরি, ছি ছি! তাও বিয়াইত্যা ব্যাডা। গেরামের মদ্যে পাপ ঢুকছে। অরে এই গ্রাম থিকা যত্ত তাড়াতাড়ি বিদায় করোন যাইবো ততোই মঙ্গল।

কিন্তু তারে তো নাকি বেহুশ অবস্তায় পইরা থাকতে দেখছে জামাল কাজি। ফজরের নামাজ পড়োনের জন্যে উযু কইরা ফেরার সমায় দেখছে শিখারাণী ঘাটে পইরা রইছে। 

শিখারাণীর মাসতুতো বোন সূবর্ণার কথাকে চাপা দিয়ে পলাশি বেগম বলে ওঠে, পিন্দনের কাপড়ে রক্তের দাগ আছিলো। বোঝছ না কিছু? ওইগুলিন সব মিছা কতা। জামাল কাজি নিজের মান বাঁচানের লইগা ওইসব কিচ্ছা বানাইছে। তার বিবি-বাইচ্চা আছে না? আসল কতা পোক্কাশ হইলে বিবি থাকবো তার ঘরে?

সেইদিন সন্ধ্যা নামার পরেই একে একে সবাই যখন উঠোন খালি করে যার যার গন্তব্যের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, সেই পায়ে পায়ে পা মিলিয়ে সকলের অলক্ষ্যে অভিযুক্ত মেয়েটিও বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে অন্ধকারে মিলে যায়।

এরপর শিখারাণীর জীবন নদী প্রবাহিত হয়েছে কত বাঁকে, কত অন্ধকারে দিক হারিয়ে ফের আলোর দেখা পেয়ে চিকচিক করে উঠেছে ঢেউ, কতবার ভেঙেছে, কতবার গড়েছে, কত উপচে পড়ে থই থই করেছে। আবার বিষণ্ণতার ঘোলাজলে মুখ থুবড়েও পড়েছিল কত কত প্রহর!

কুড়িটা বছরে সে দেখেছে এই সমাজ ও সমাজের মানুষের হাজারো কুড়ি কুড়ি রূপ। কিন্তু এখনো গা শিউড়ে ওঠে সেদিনের স্মৃতি মনে করে।

শিখারাণীর ন’ বছর বয়সে তার মা কোন এক অজানা রোগে বছর দেড়েক ভুগে একদিন চিতার আগুনে জ্বলে চিরতরে বিদায় নিলেন। আর তখন শূন্যঘর পূর্ণ করতে মালতি এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে ওই বাড়িতে। সদ্য মা-হারা মেয়েটি দূর সম্পর্কের পিসীকে পেয়ে প্রথম প্রথম স্নেহের আবদার নিয়ে আকড়ে ধরেছিল। কিন্তু একেবারে তো শিশুটি ছিল না সে। আর নিজের বাবা এবং মালতি পিসীর কার্যকলাপই তাকে দ্রুত বড় করে তোলে। শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে সে এই পৃথিবীর আলো-অন্ধকার অনেক কিছুর সাথে পরিচিতি লাভ করে। আর যতোই সে বুঝে ততোই মালতির প্রতি তার ঘৃণার প্রকোপ বাড়তে থাকে।

শৈশবের রঙিন ঘুড়ি নিয়ে সেও অন্যসব শিশুদের সাথে দিনরাত মেতে থাকতো। তখন থেকেই কিছুটা জেদি এবং স্পষ্টভাষী স্বভাবের কারণে কারো কারো কাছে সে ছিল অবজ্ঞার। আবার কারো কাছে আদরের। এমনি দাপিয়ে বেড়ানো শৈশবের কোন এক পৌষের শেষরাতে মাসতুতো বোন সূবর্ণার কাছ থেকে নতুন এক অভিজ্ঞতা অর্জন করে সে।

সূবর্ণা খিলখিল করে হেসে জবাব দেয়, খুব দেরি নাই, দেইখো তোমারও হইবো শিগগীর। আর তহন বুঝবা কেমন লাগে!

তারই দিন চারেক বাদে শেষ রাতে সুপাড়ি গাছে যখন বাদুরের পাখা ঝাপটানির শব্দ হচ্ছিল, শরীরজুড়ে এক অচেনা অজানা অনুভূতিতে শিখারাণীর ঘুম ভেঙে যায়। ধীরে ধীরে সেই অনুভূতিটা তীব্র যন্ত্রণাকর হয়ে ওঠে। প্রচন্ডরকম অসহ্য মনে হলে সে মালতীর ঘরে টোকা দিয়ে ডাকে, ও পিসী দোড্ডা ইট্টু খুলবা? প্যাটটা অনেক ব্যথা করে ইট্টু বাইরে যাইতাম।

কয়েকবার ডাকার পরে মালতি ভেতর থেকে জবাব দেয়, এই শীতের রাইতে কোন্ ঘাডে মরনের লইগা আমারে ডাকতেছোস? যা ইকান থে।

আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে একলাই দরজা খুলে বের হয়। পূবাকাশের কিনারাটা তখন সদ্য কুয়াশা ঠেলে ফরসা একটা আভার জানান দিচ্ছিলো। সেই আভার পথ ধরে ঘটিতে জল তুলতে ঘাটে নামতে গিয়ে কয়েক ধাপ পা ফেলেই সে অনুভব করে ঠান্ডা শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে উষ্ণ এক তরল রাশি। সেই সাথে সমস্ত শরীরও ভেঙেচুড়ে আসছে। ভয়ে আতংকে যন্ত্রণায় সে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে সেখানেই পড়ে যায়।

জামাল কাজি চায়ের কেতলি হাতে পাশের ঘাটে অজু করতে আসে। রোজই সে ফজরের আজান হলে ঘাটে অজু করে কেতলি ভরে পানি নিয়ে যায়। দোকানে যেয়ে চুলায় চায়ের কেতলি বসিয়ে দিয়ে নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে দু/চারজন পরিচিত লোক রোজই তার দোকানে বসে ভোরের প্রথম চা এবং বানরুটি খেয়ে দিন শুরু করে।

কেতলি নিয়ে দুই ধাপ উপরে উঠতেই তার দৃষ্টি পড়ে পাশের ঘাটে। কাছে গিয়ে অচেতন শিখারাণীকে দেখতে পেয়ে সে চমকে যায়। প্রায় পাজাকোল করে তুলতে গিয়ে কি জানি কি মনে করে তড়িতড়ি ফের মেয়েটিকে যেভাবে পড়েছিল সেভাবেই রেখে জোরে জোরে কদম ফেলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। আর ঠিক ওইসময়েই খেঁজুর রসের হাড়ি নিয়ে গাছ থেকে নামে কাঞ্চন চৌকিদার। যার সাথে জামির সীমানা নিয়ে যুগাধিকাল ধরে সোহরাব কাজির বিরোধ।

সুযোগটা সে কাজে লাগায়। ছুটে গিয়ে মালতি এবং শিখারাণীর বাপকে ঘর থেকে ডেকে আনে এবং বলতে থাকে, আমি নিজ চোক্কে দেখছি ওই জামাল কাজি আপনেগো শিখার লগে নষ্টামি করছে। তারপর তারে ফালাই রাইখা ভাগছে।

এরপর আর কিছু করতে হয় না তাকে। সত্য-মিথ্যা এক করে মালতিই অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যায় কাহিনী। তারপর বাকিটা নানা রঙে নানা ঢঙে আকারে কাহিনী এগিয়ে চলে বহুমাত্রিক গতিতে।

সময়ের গতির চেয়েও দ্রুত গতিতে গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ে এই ঘটনা। হ, মাইয়াটাই খারাপ। সে কেন্ আন্ধার রাইতে ঘরের থে বাইর হইলো, ওই মোসলমান জামাইল্যার লগে বহুত আগেত্থেই অর লাইন। অর এই গ্যারামে থাহোন চলবো না। আইজই শালিশ ডাইকা এর একটা বিহীত করোন লাগবো।

তারপর সেই উঠোন বৈঠক। যাতে বিচারকের আসন থেকে রায় হয় কিশোরী বালিকা শিখারাণীকে পরেরদিন ভোরের আলো ফুটতেই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে। চলে যায়ও মেয়েটি। সে হয়তো চলে যায়, কিন্তু যুগে যুগে রয়ে যায় হাজারো শিখারাণী। যাদের প্রস্থান কখনোই হয় না। কখনোই মুছে যায় না তাদের কলংকের দাগ!


মেহেরুন নেছা রুমার গল্প দাগ

কেমন লেগেছে আপনার কমেন্টে জানান।

লেখক মেহেরুন নেছা রুমার এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলো দেখুন।   


আরও গল্প পড়ুন- 

ছোটগল্প: জোয়ার-ভাটা | পিন্টু রহমান

ছোটগল্প: প্রেমগুলো নদী হয়ে যায় | সাইফুল্লাহ সাইফ

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!