যখন থামবে কোলাহল

যখন থামবে কোলাহল

ধারাবাহিক উপন্যাস: যখন থামবে কোলাহল- মারুফ ইমন | ১৯’শ কিস্তি

মারুফ ইমনের ধারাবাহিক উপন্যাস যখন থামবে কোলাহল:


আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি | চতুর্দশ কিস্তি | পঞ্চদশ কিস্তি | ষোড়শ কিস্তি | সপ্তদশ কিস্তি | অষ্টাদশ কিস্তি | ১৯’শ কিস্তি 


যখন থামবে কোলাহল

(১৯’শ কিস্তি) 


 

জায়গার নাম ভবানীপুর, গাজীপুরের ভেতরেই। ঢাকা ময়মনসিংহ সড়কের একপাশে থেমে আছে করোলা এক্সিও এক্স মডেলের গাড়িটা, রাস্তার দুপাশে জঙ্গল। একটু দূরে একটা লোহা লক্করের দোকান দেখা যাচ্ছে আর তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান, তবে আশপাশে মানুষের ঘরবাড়ি নেই বললেই চলে।

কিছু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী আছে তা বিলবোর্ডে নাম লেখা দেখে বোঝা যায়, সেগুলোর বর্জ্য থেকে একটা উটকো গন্ধ আসছে। গফরগাঁও যাবার পথে এখানে এসে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। রিচি গাড়ির ভেতরে বসা, তার অসহ্য লাগছে। তার সাথে যাচ্ছে সাদমান।

তবে সে বাইরে কোথায় যেন গেছে। ড্রাইভার গাড়ি দাড় করিয়ে সামনের দিকটা খুলে কি যেন করছে, মিনিট পনের হয়ে গেছে। রেজা খান সকাল থেকে এর মাঝে দশ বারের মত ফোন দিয়েছেন, পারলে তিনিও চলে আসতেন। তবে হঠাৎ তার শরীর খারাপ করায় সাদমান তাকে বুঝিয়ে মানা করলো না আসতে। রিচি কিছুটা অবাক হয়েছিল এই ভেবে সাদমানের কথা রেজা খান ভালই শোনে, সাদমান ছেলেটা কথাও কম বলে।

এই যে সকাল আটটায় বের হয়েছে দুজন গফরগাঁও যাবে বলে, প্রায় দুঘন্টা চলে গেছে। এর মাঝে সাদমান গুনে তিনটি কথা বলেছে। রিচি সেগুলো মনেও রেখেছে। গাড়িতে উঠার পরপরই এসি থাকবে কিনা জিজ্ঞেস করলো, এরপর একবার বলল কাগজপত্র সব নেয়া হয়েছে কিনা। আর কোন কথা নেই।  

তারপরেই গাড়ি কিছুক্ষণ আগে ব্রেক কষে হঠাৎ থেমে গেল, ড্রাইভার নেমে একটু দেখে বলল কয়েকটা তার পুড়ে গেছে, আপাতত টেপ লাগাতে হবে।

 

সাদমান নেমে গেল, আবার একটু ফিরে এসে বলল, ‘মিস. রিচি, নামবেন কি?’

রিচি মাথা নাড়লো, এই রোদের মধ্যে রাস্তার মাঝখানে তার নামার কোন আগ্রহ নেই। সাদমান কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে হাওয়া, ড্রাইভারের সাথে আলাপ করে নাম্বার নিয়ে গেছে অবশ্য। রিচি কিছুটা অবাকই হয়েছে বলা যায়। সে নিজেকে জানে, দেখতে শুনতে স্মার্ট ও সুন্দরী, আর ইমেজ যথেষ্ট পরিষ্কার।

এতক্ষণ পাশে বসেও সাদমান রিচিকে ব্যক্তিগত কোন প্রশ্নই করেনি। কিছু পুরুষ হয়তো সমাধান নিয়ে সমস্যার জন্য অপেক্ষা করে, উত্তর জমা করে প্রশ্নের আশায় থাকে। সাদমান তেমন হতে পারে।

তাতে রিচির কিছু যায় আসে না, আবিদের পর রেজা খানের ঘটনা। যার সাথে একগাঁদা প্রশ্ন বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছে রিচি। তবু এখন তাকে আর কোন পুরুষের ব্যক্তিত্ব টানে না। সাদমানও তার বাইরে না। 

 

রিচির পাশের সিটেই সাদমান বসে ছিল, সেখানে একটা বই পরে আছে। সে মুখ গুজে শুধু একটা বই পড়ছিলো। রিচি হাতে নিয়ে বইটার নাম দেখলো – দ্য রেকেটিয়ার, লেখকের নাম জন গ্রিশাম। বইয়ের কাভারে একটা স্যুট হ্যাট পরা লোকের ছায়া, দেখে মনে হচ্ছে রহস্য টাইপ বই। তার ইংরেজীর বই খুব একটা ভাল লাগে না।  

রিচি কি সব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ লেগে এসেছিল, সিটেই হেলান দিয়ে সে ঘুমিয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠে সে অবাক। গাড়িটা চলছে, কাঁচের বাইরে একটা খালের মত দেখা যাচ্ছে, আর কি সবুজ ! একদল ছেলেমেয়ে কে দেখা গেল খালের একপাশে যেখানে পানি কম সেখানে কাদা ছুড়াছুড়ি খেলছে।

রিচি তার সিটে তাকাতেই ভুলে গেল। তার কেন যেন খুব আনন্দ হচ্ছে। ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। বাসার সামনে বৃষ্টির পানি জমলে সে পা দিয়ে সেটা কাদা কাদা করতো। তারপর, সেখানে একা একাই খেলতো। তার মা বলতেন গোসলের আগে এসব করতে, কিন্তু অনেক সময় বৃষ্টিটাই যে নামতো বিকেলে আর রিচির কাদা খেলা শুরু হত তার পরে। মা অনেক সময় তাই গায়ে এই কাদা লাগানোর জন্য বকতো, পিঠে কয়েকটা বসাতো চড় থাপ্পড়।

 

‘আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন, তাই ডাকিনি। আমরা আর ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পৌছে যাব।’ পাশ থেকে বলল সাদমান। ‘আসলে এক ঘন্টার পথও না, রাস্তা ভাল না তাই ড্রাইভারকে বলেছি ধীরে চালাতে।’

 

‘ইটস ওকে, আসলে কখন যে ঘুমালাম।’ রিচি কথা বলতে বলতে হাই তুললো। 

 

সকালে ঘুম না হলে রিচি এভাবে যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পরে। গাড়িতে সে কখনোই ঘুমায় না, অথচ আজ ঘুমিয়ে গেছে। রিচি আবার বাইরে তাকালো। একটা ছোট ব্রিজ পার হবার পর আর খালটা চোখে পড়ছে না।

 

‘খালটা সুন্দর না?’ সাদমান রিচির দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো।

‘হ্যা, আরো পানি থাকলে ভাল হত’ রিচি এখনো বাইরে তাকিয়ে আছে।

 

‘নামবেন?’ সাদমানের কথা শুনে অনেকটা চমকে তাকালো রিচি। তার মনের কথাই যেন বলেছে সাদমান। তার খুব ইচ্ছে করছিলো খালের পানিটা একটু ছুঁয়ে দেখতে। সাদমান ড্রাইভারকে গাড়ি ঘুরাতে বললো। 

রিচি বিনাবাক্য ব্যয়ে রাজি হলো, অবাক হল নিজের প্রতিই। সে কেন ওর কথায় রাজী হলো? সে তো কারো কথায় এখন আর মত বদলায় না, তবে সাদমানের কথাই কেন শুনছে?   

 

খালটার কাছে যেতে গাড়ি থামিয়ে তাদের কিছুটা পথ আরো হেটে পেছনে যেতে হল। রাস্তাটা একটু উঁচুতে, তাই একটা রাস্তা কাটা জায়গা দিয়ে তাদের নামতে হবে। সাদমান আগেই নেমে গেল, রিচি কিছুটা ভয় পেল। কারন, নামার জায়গাটা অনেকটাই খাড়া।

রিচির খুব রাগ হল। একটা মেয়েকে রেখে একা নেমে চলে যাওয়াটা ছেলেদের সাথে যায় না। সাদমান হাটতে হাটতে নিচে গিয়ে পানিতে নেমে গেলেও রিচি উপরেই দাঁড়িয়ে আছে।

 

এমন সময় পেছনে তাকিয়ে রিচি চমকে গেল। প্রায় দশ বারোটা ছেলেমেয়ে সাত আট বছরের বেশি হবে না রিচির ঠিক পেছনে দাড়িয়ে আছে। এবার তার কেমন যেন লজ্জা লাগলো। ছেলেমেয়েদের মধ্যে দু তিনটা ছেলে আবার ন্যাংটো, গায়ে কিছু নেই। শুধু কোমড়ের দিকে সুতোর মত কি যেন একটা বাধা, তার একপাশে একটা তাবিজ।

এদের দলে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলাও এসে যোগ দিলেন। তার হাতে একটা বাঁশের কঞ্চি, হয়তো কাউকে মারের ভয় দেখিয়ে নিতে এসেছেন। কিন্তু অজ পাড়াগাঁয়ে এমন অচেনা অপরিচিত পোষাকে ঢাকা মেয়েকে দেখে মারের কথা ভুলে গেছেন।

 

‘নামবেন?’ মহিলা একটু হেসে জিজ্ঞেস করল। দাঁত দেখেই বোঝা যায় পান খাওয়ার সাথে তার গভীর সম্পর্ক। তার শরীরের ব্লাউজ কয়েক জায়গায় ছেড়া। ন্যাংটো ছেলেদের একজন ধীর পায়ে এসে সেই মহিলার সাথে দাঁড়ালো, তার কাপড়ের একটা অংশ মুখে নিয়ে চিবুতে লাগলো। দূর থেকে সাদমানের চিৎকার শোনা গেল।

‘উনাকে ধরে নেমে আসুন। শক্ত করে ধরবেন, পড়ে গেলে একেবারে পানিতে কিন্তু। ’ শুনে রিচির গা জ্বলতে লাগলো।

 

‘জ্বি নামবো’ রিচি কিছুটা সংশয় নিয়েই বলল।

 

মহিলা ছেলেটিকে কাপড় থেকে সরিয়ে রিচির দিকে হাত বাড়ালেন। মহিলার হাত দেখে কিছুটা ভয়ই লাগলো, ফেটে কেটে অনেক জায়গায় দাগ পরে আছে। রিচি আর কোন কিছু না ভেবে হাত দিল। মহিলা একেবারে কাছে গিয়ে ধরে রাখলো রিচি কে। রিচি পুরোপুরি নামার আগে কিছুটা জায়গায় দৌড়ে নামতে হল। মহিলা পুরো শরীর নিচের দিকে দিলেও পড়েন নি।

 

বিকেল হয়ে এসেছে প্রায়। তবু সূর্যের তেজ এতটুকু কমেনি। ফাগুনের শুষ্কতায় খালের পানি শুকিয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে। পেছন ফিরে রিচি দেখলো একদল মানুষ জড়ো হয়েছে তাদের দেখতে, রিচির কেমন একটু লজ্জাই লাগছে।

 

সাদমান প্যান্ট হাটু পর্যন্ত তুলে পানিতে দাড়িয়ে আছে। একটু পরপর সরে যাচ্ছে। রিচি তার কাছে গেল না। সে একটু দূরে স্বচ্ছ পানিতে হাত দিতেই এক অদ্ভুত শীতলতা অনুভব করলো। সে পানি দু হাতের তালুতে নিয়ে দেখলো তার মুখ। 

পানির মাঝে যে রিচিকে দেখা যায় তাকে চেনা যায় না। অন্য কেউ হবে হয়তো। একজন পেরেছিল, তাকে রিচি ভালোবেসেছিল প্রচণ্ড। তাকে হারিয়ে রিচির আর পানির জলে মুখ দেখতে ইচ্ছা করে না। হাত গড়িয়ে পানি পড়ে যায় দুটি আঙুলের ফাঁক বেয়ে। রিচি তাকিয়ে থাকে খালি হাতের দিকেই । হঠাৎ একটা পরিচিত কন্ঠ শুনে ফিরে তাকায় রিচি। 

 

‘পানি অনেক ঠান্ডা, তাইনা?’ সাদমান হাসিমুখে দাড়িয়ে আছে রিচির ঠিক পেছনে।

 


(চলবে)

 

উপন্যাসের সবগুলো পর্ব একসাথে:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি চতুর্দশ কিস্তি পঞ্চদশ কিস্তি | ষোড়শ কিস্তি | সপ্তদশ কিস্তি | অষ্টাদশ কিস্তি | ১৯’শ কিস্তি 

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!