যখন থামবে কোলাহল

যখন থামবে কোলাহল

ধারাবাহিক উপন্যাস: যখন থামবে কোলাহল- মারুফ ইমন | ২২’শ কিস্তি

মারুফ ইমনের ধারাবাহিক উপন্যাস যখন থামবে কোলাহল:


আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি | চতুর্দশ কিস্তি | পঞ্চদশ কিস্তি | ষোড়শ কিস্তি | সপ্তদশ কিস্তি | অষ্টাদশ কিস্তি | উনবিংশ কিস্তি | বিংশ কিস্তি |একবিংশ কিস্তি | ২২’শ কিস্তি  


যখন থামবে কোলাহল

(২২’শ কিস্তি)


 

হোস্টেলের ভেতরে পুরুষ মানুষ ঢোকার অনুমতি নেই।

তাই আজিমুদ্দিন বাইরে গেটম্যানের ঘরে বসে আছেন, গেটম্যান আজিমুদ্দিনকে রেখে বাইরে গেছে। সে আজিমুদ্দিনকে চেনে, জিনাতের সাথে দেখা করতে আসলে তাই তিনি এখানেই বসেন।

ঘরে কি যেন একটা বাজে গন্ধ। ছোট একটা খাট আর একটা আলনা আছে, আর আশপাশে ছড়ানো কয়েকটি ব্যাগ। আজিমুদ্দিনের শরীর খারাপ লাগছে। একটু বমি বমি ভাবও হচ্ছে, দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি। খেতে ইচ্ছেও করছে না।

 

ইলিয়াস মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তার সাথে দেখা হয়নি আজিমুদ্দিনের। অনেকক্ষণ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে শব্দ করার পর বোরকা পড়া এক মহিলা আসলো। স্বর শুনেই বুঝা গেল ইনি ইলিয়াসের স্ত্রী। আজিমুদ্দিন কিছু বলার আগেই হু হু করে করে কেঁদে ফেললেন মহিলা।

তার বোরকা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল একটা বাচ্চা, ছেলে না মেয়ে ঠিক বোঝা যায় নি, একে আগে দেখেননি তিনি। মহিলার কান্না থামছিল না, একটি বাক্য শেষ করতে তার অনেক সময় লাগছিল। কোন কিছু শোনার তীব্র আকাঙ্খার সময় কেউ কান্না করলেও একটা সময় বিরক্ত লাগে।

আজিমুদ্দিন কিছুটা বিরক্ত হয়ে গেলেন, কিন্তু বুঝতে দিলেন না। একজন মানুষ তার কষ্টের কথা বলতে গেলে কেঁদে দেয়, সবাই কাঁদে না। তবে চোখের সামনে কান্না দেখলে বিরক্ত হলেও সেটা চেপে রাখতে হয়। এটা সৌজন্যতা না, বাধ্যতা।

 

মহিলা কেঁদে কেঁদে যা বলল তার সারমর্ম হল, প্রায় দিন পাঁচেক আগে মাঝ রাতে ঘটনাটা হয়েছে। ইলিয়াস কোরানের তাফসির পড়ে ঘুমাতে যাচ্ছিলেন।  কয়েকজন সাদা পোশাক পড়া লোক এসে হঠাৎ ঘরে ঢোকে, জিজ্ঞেস করলে জানায়, তারা পুলিশের লোক। প্রায় আধঘন্টা ঘরের সব তছনছ করে কি যেন খোঁজে। তারপর ইলিয়াসকে তাদের সাথে যেতে বলে, সে কাউকে ফোনে কিছু বলতে চাইলে বলতে দেয়া হয়নি।

পরে একজন এসে হাত থেকে মোবাইল টান দিয়ে নিয়ে যায়। ইলিয়াস মিয়ার পড়ার ঘরে কিছু হাদীসের বই আর দুটা কোরান শরীফ ছিল, তারা সেগুলোও নিয়ে গেছে। ইলিয়াস পুরোটা সময় চুপচাপ ছিলেন, যেন তিনি আগে থেকেই জানতেন এমনটা হবে।

যাবার আগে কোনরকমে তার স্ত্রীর কানেকানে বলে গেছেন থানায় তার খোঁজ করতে। ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’ বলতেই বলতেই ইলিয়াসকে টেনে একটা ভ্যানে তোলা হল। বাচ্চারা ঘুমিয়ে ছিল, স্ত্রী হতম্ভব হয়ে কাঁদতে শুরু করে আর তার ভাই কে ফোন করে সে থানায় যায়।

 

সকালে ইলিয়াসের শ্যালক আর স্ত্রী প্রায় তিনঘন্টা বসে থাকার পর থানা থেকে জানানো হল, ইলিয়াসকে এখানে আনা হয়নি। এই নামে কাউকে গ্রেফতারও করা হয় নি। এরপর গত পাঁচদিন ধরে থানায় আসা যাওয়া করছে তার স্ত্রী। কোন হদিস নেই।

ঘটনা শুনে আজিমুদ্দিন আর বাসার ভেতর যাবার প্রয়োজনবোধ করলেন না। আপেল আর চিপসের প্যাকেট দিয়ে তিনি চলে আসলেন, অনেক জোরাজুরি করে তিনি ইলিয়াসের স্ত্রীর হাতে কিছু টাকাও দিয়ে আসলেন।

তারপর একটা রিক্সা নিয়ে সোজা জিনাতের হোস্টেলে। গেটে আনুর সাথে দেখা হল আজিমুদ্দিনের, সে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তার কাছে জানতে পারলেন জিনাত হাসপাতালে আছে, চলে আসবে। 

 

গেটম্যান আরজু তাকে দেখেই সালাম করে ঘরে নিয়ে বসায়। ছেলেটার আদব কায়দা ভালই, মুখও হাসিখুসি। বয়স খুব বেশি হলে ২২, তবে দেখে আরো কম মনে হয় চেহারায় একটা বাচ্চামি থাকায়। আজিমুদ্দিন জিনাতের জন্য কিছু পিঠা আর আপেল নিয়ে এসেছেন।

সেখান থেকে আরজুকে তিনি দুইটা পুলি পিঠা আর আপেল দিলেন। ওর গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ, এখানে আসার মোটামুটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এর আগে আজিমুদ্দিন যতবার এসেছেন, আরজু তাকে প্রতিবার সেই ইতিহাস বলেছে নতুন উৎসাহে।

দেশের অনেক বড় ইতিহাসও অনেক সময় বিকৃত হয়ে যায়, কিন্তু আরজু নতুন উদ্যমে অবিকৃতভাবে তার ইতিহাস বলে। আজ অবশ্য তার কি যেন একটা জরুরী কাজ ছিল। আজিমুদ্দিনকে তার ঘরে বসিয়ে সে খাবার পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,

‘চাচা, খাইছেন দুপুরে?’

আজিমুদ্দিন মিথ্যা বললেন, ‘হ্যা খেয়েছি।’

‘আপনারে দেইখা অনেক দূর্বল লাগে, শুইয়া থাকেন। চাচা, এইডা নিজের ঘর মনে করবেন, পেপার আছে পড়েন। আমি একটু বাইরে যাব আর আসবো। এর মধ্যে যদি আফামনি আইসা পড়ে তাইলে তো হইলো, নাইলে আমি আইসা পড়বো।’ বলেই আরজু হাওয়া হয়ে গেল।

 

আরজুর গিয়েই চলে আসার কথা থাকলেও প্রায় দুঘণ্টা হয়ে গেলেও তার কোন আসার নাম নেই। আজিমুদ্দিন কিছুক্ষণ পেপার পড়ে শরীর খারাপ লাগার সাথে মাথাও ব্যথা শুরু হয়ে গেল। পেপারে যুদ্ধপরাধীদের বিচার, অবরোধ আর নির্বাচন ছাড়া আর তেমন কোন খবর নেই বললেই চলে।

আর বিনোদনে পড়লেন এক নায়িকার সাথে নাকি আরেক নায়কের বিয়ের গুঞ্জন চলছে। তারা এক বাসাতেই থাকছেন, তবে সম্পর্কের ব্যপারে মুখ খুলেননি কেউ। দুজনেই বোম্বের সিনেমার স্টার, তাই আগামী সিনেমার পাবলিসিটির জন্যও এমন কিছু তৈরি করা হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

নায়িকা যথেষ্ট লাস্যময়ী, আজিমুদ্দিন হিন্দী না বুঝলেও তার সিনেমার জগৎ নিয়ে ভাল আগ্রহ আছে। তবে এখন পেপারে সিনেমার খবর থেকে এর কলাকুশলীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বেশি আলোচনা হয়, এটা তার ভাল লাগেনা। তিনি বুঝতেই পারেন না, এটাতে চলচ্চিত্রের কি লাভ! একজন অনেক বয়স হয়েছে বিয়ে করেনি, আরেকজন তার হাটুর বয়সী কাউকে বিয়ে করেছে দুটিই আলোচিত। ব্যপারটা এমন কোন কাজ করার আগে মিডিয়ার অনুমতি নেয়াটা জরুরী হয়ে গেছে। সেটাও মন্দ না।

 

আজিমুদ্দিন কখন আরজুর বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছেন তা তিনি টেরই পাননি। গভীর ঘুম, ঘুমের ভেতর তিনি স্বপ্ন দেখলেন– তিনি একটা রেল স্টেশনে বসে আছেন। স্টেশনের ছাদটা খুব বেশি জায়গা জুড়ে নেই, প্ল্যাটফর্মের তিনভাগের একভাগ। অবাক করা ব্যপার, স্টেশনে একটা লোকও নেই। কাউন্টার আছে, কিছু দোকান আছে, বুক স্টলও আছে কিন্তু সব বন্ধ।

আজিমুদ্দিন বুঝে পেলেন না, টিকিট কাউন্টারটা বন্ধ কেন? টিকিট বিক্রি না হলেও কেউ না কেউ থাকে ভেতরে। এখানেও হয়তো আছে, ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু এই অবেলায় ঘুম কেন? আজিমুদ্দিন তার ঘড়ি দেখলেন, একটা মাত্র কাটা। অথচ তার ঘড়িতে তো তিনটা কাটাই ছিল, নাম্বার দেয়াও ছিল। হুট করে কোথায় গেল। এত পুরনো ঘড়ি , কাটাগুলো ছাড়া কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগছে।

 

হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। আজিমুদ্দিন কোথায় যাবেন তিনি জানেন না, পকেট হাতড়ে টিকিট খুঁজলেন, তার পকেটে কিচ্ছু নেই। তবে তার যেন মনে হচ্ছে, তাকে এই ট্রেনেই যেতে হবে। তাড়াহুড়া করে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালেন । একটু দুশ্চিন্তাও হল, টিকিট ছাড়া যেতে হচ্ছে বলে। চেকার টিকিট চাইলে কি বলবেন বুঝতে পারছেন না।

অবশ্য অনেক সময় টিকিট না দেখেই চেকার চলে যায়। তিনি দূর থেকে আসা ট্রেনটা দেখতে পেলেন, বেশ জোরেই আসছে। স্টেশনের কাছে আসলে ট্রেন এত জোরে আসার কথা না, ট্রেনটা কি তাহলে থামবে না এখানে? চিন্তা হচ্ছে, তাকে তো এই ট্রেনেই যেতে হবে। না উঠতে পারলে কিভাবে হবে? গালে হাত দিয়ে অভ্যাসবশত আজিমুদ্দিন চুলকাতে থাকেন।

তার কেমন একটু মসৃন লাগলো। অবাক হয়ে গেলেন তার মুখে একদম ক্লিন শেভড। মনে হচ্ছে তার এখনো গোঁফ দাঁড়িই হয়নি। কি আশ্চর্য! ট্রেনটা এত জোরে এসেও একদম প্ল্যাটফর্মে এসে থেমে গেল। যেন বাসের মত ব্রেক কষলো। তার চেয়েও আশ্চর্য ঘটনা হল, পুরো ট্রেন ফাকা। সবশেষ স্টেশনে এসে ট্রেন থামলে যখন সব যাত্রী নেমে যায় তখন ট্রেন এমন ফাঁকা হয়।

তিনি উঠে পড়লেন, কোন সিটে কোন যাত্রী নেই, তার কেমন যেন একটু ভয় ভয় লাগলো এই ভেবে হয়তো ট্রেনে কোন ড্রাইভারও নেই। উন্নত দেশে নাকি ড্রাইভার ছাড়াই গাড়ি চলতে পারে এখন, ট্রেনে সেটা চালু হয়েছে কিনা আজিমুদ্দিনের জানা নেই। আর চালু হলেও এদেশে সেটা এত দ্রুত চলে আসার কথা না।

তার মনে পড়লো, ময়মনসিংহ থেকে একবার জারিয়া যাবার সময় ট্রেনে একটাও লোক ছিল না। ট্রেনটা ছেড়ে দিল কোন হুইসেল না দিয়েই। সিটের সমস্যা নেই, শুয়েও যাওয়া যায় ইচ্ছা করলে। আজিমুদ্দিন শুয়ে পড়লেন। ট্রেনের সিটে শুয়ে থাকলে ঝিকঝিক এর সাথে থুম থুম একটা শব্দও শোনা যায় এটা তার জানা ছিল না।

একটা বিড়াল দেখে শোয়া থেকে বসে গেলেন আজিমুদ্দিন, বিড়ালটা একদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে হেটে হেটে আসছে। খালি, চলন্ত একটা ট্রেনে বিড়াল কোথা থেকে এল, সেই চিন্তা মাথা থেকে উবে গেল তার। তবে বিড়ালটাকে খুব নিরীহ মনে হল। ধীরে ধীরে বিড়ালটা তার পায়ের কাছে এসে মাথা নিচু করে তাকালো, তার আঙুল চাটতে লাগলো। আজিমুদ্দিন পা ঝাড়া দিয়ে উঠে গেলেন।

উঠে দেখেন তিনি বিছানায়, তার পায়ের কাছে জিনাত বসে আছে। আজিমুদ্দিন হাঁপাচ্ছে, জিনাত বলল, ‘আব্বা, বাজে কোন স্বপ্ন দেখেছো?’

 


(চলবে)

 

উপন্যাসের সবগুলো পর্ব একসাথে:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি চতুর্দশ কিস্তি পঞ্চদশ কিস্তি | ষোড়শ কিস্তি | সপ্তদশ কিস্তি | অষ্টাদশ কিস্তি | উনবিংশ কিস্তি | বিংশ কিস্তি | একবিংশ কিস্তি  | ২২’শ কিস্তি  

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *