ধারাবাহিক উপন্যাস: যখন থামবে কোলাহল- মারুফ ইমন | ২৩’শ কিস্তি

মারুফ ইমনের ধারাবাহিক উপন্যাস যখন থামবে কোলাহল:


আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি | চতুর্দশ কিস্তি | পঞ্চদশ কিস্তি | ষোড়শ কিস্তি | সপ্তদশ কিস্তি | অষ্টাদশ কিস্তি | উনবিংশ কিস্তি | বিংশ কিস্তি |একুশতম কিস্তি | বাইশতম কিস্তি  | ২৩’শ কিস্তি

 


যখন থামবে কোলাহল

(২৩’শ কিস্তি)


 

হাসপাতালের গেটের ঠিক সামনে চায়ের দোকানে একটা ঝামেলা হয়েছে। একটা কমবয়েসী ছেলেকে কয়েকজন খুব করে পিটিয়েছে। ছেলেটার বেশভূষা দেখে মাদ্রাসার ছাত্র মনে হয়। অবরোধের মিছিল যাচ্ছিল পাশের রাস্তা দিয়ে খুব সকালেই।

সেখানে হঠাৎ পুলিশের ধাওয়ার কবলে পড়লে মিছিলের সবাই যে যার মত দৌড় দেয়। ছেলেটি পড়ে যায় রাস্তায়। এরমধ্যে কয়েকজন চিৎকার করে জানান দিয়ে ছুটে এসেছে পুলিশকে সাহায্য করতে, তাদের হাতেও লাঠিসোটা। বলা যায় ছেলেটি অনেকটা একাই মার খেয়েছে।

সরকার মিটিং মিছিল ঠেকাতে খুব তৎপর আবার বিরোধী দলও খুব শক্ত অবস্থানে আছে রাস্তায় তাদের শক্তি জানান দিতে। যদিও সেই শক্তি অনেকটাই কমে এসেছে। প্রচুর ধরপাকড় আর পুলিশের নজরদারিতে তাদের আন্দোলনে ভাটা পড়েছে।

তার প্রভাব পড়েছে মিছিলেও। সরকার আর বিরোধী দল দুজনেরই দাবি, জনগণ তাদের সাথে আছে। কিন্তু জনগণ আসলে তার নিজের সাথেই আছে। কেননা, মাসখানের ওপর অবরোধ চলে যোগাযোগ, বাজার ঘাট, ব্যবসা বাণিজ্যে খারাপ অবস্থা যাচ্ছে। তাদের বেশিরভাগের মন ভাল নেই।

 

সকালের ঘটনাটা মোটামুটি কাছ থেকেই দেখেছে অনিন্দিতা। সে গিয়েছিলো নিচে পানি আনতে, তখনই অজ্ঞান অবস্থায় ছেলেটাকে হাসপাতালে আনা হয়। মাথা ফেটে রক্ত পড়ায় অবস্থা যে খুব ভাল নেই তা সবাই বলাবলি করছে, মারাও যেতে পারে।

অনিন্দিতা এই দৃশ্য দেখে পানি না নিয়েই এক দৌড়ে রুমে এসে হাপাতে থাকলো। রক্ত দেখলে তার মাথা ঠিক থাকে না। এতদিন ধরে হাসপাতালে পড়ে আছে কিভাবে সেটাও একটা আশ্চর্য ব্যপার।

সাদাত শেষরাতে ঘুমিয়েছে, তার সারারাত ঘুম হয় নি। একটু পর এপাশ ওপাশ করেছে শুধু। পাশের লোকটিও ঘুমাচ্ছে দেদারসে। সকালের এই অস্থিরতা তাদের স্থির ঘুমের কোন বৃহৎ চ্যুতির কারন হতে পারে নি।

 

অনিন্দিতা কিছুক্ষণ শুয়ে রইল। তার শরীর এখনো কাপঁছে, ঘেমে আছে সে। সুব্রত কাল রাতে বাড়ি ফিরে গেছেন, একেবারে সাদাতকে নেয়ার সময় আসবেন দুদিন পর। অনির চোখ পড়লো সাদাতের দিকে, কি মায়াময় একটা মুখ।

অনির কাছে এ ক’দিনে হাসপাতালের ফিনাইলের গন্ধ তার আর বাজে লাগে না। চাদরের ধুলো তার আর কাছে ময়লা লাগে না। সাদাতকেও তেমনি তার এখন আর দূরের মানুষ মনে হয় না। বালিশে পাশ ফিরিয়েই অনিন্দিতা যাকে দেখছে, কাছে থেকেও তার সাথে অনেক দূরত্ব তার সে জানে। আবার অজানা কারনে তার ভাবতেও ভাল লাগে সে খুব দূরেরও নয়।

 

ডাক্তার এসে সাদাতকে কিছু বলে গেছে কাল, ঠিক কি বলেছে তা অনি বুঝতে পারেনি। সে শুধু একটা কথাই বুঝলো, সময় নিয়ে ময়মনসিংহ গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। সাদাত সেটি শুনে খুব একটা কানে নিল না বলেই হল, শুধু একবার হাসলো।

 

‘আফনে উইঠা পড়ছেন?’ হঠাৎ একটা বাজখাই গলা শুনে চমকে গেল অনি। নাকডাকা লোকটি পাশের বেড থেকে উঠে পড়েছে।

 

‘আস্তে কথা কন। দেহেন না ঘুমায়?’ অনি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল, লোকটা চুপ মেরে গেল। অনি এই কথা বলে আবার কেমন যেন ভুল করে ফেলেছে মনে হল তার। কিছু মানুষের কন্ঠই এমন, কথা বললেই মনে হয় জোরে কথা বলছে। তার মধ্যে এই লোকের আবার গলায় সমস্যা, পুরো কথায় কিছু শব্দ বলতে গেলে কেমন চি চি শোনা যায়।

লোকটা বালিশের নিচে কি যেন খুঁজছে, একবার তাকিয়ে ঠিক দেখতে পারলো না অনিন্দিতা। লোকটাও একবার অনির দিকে তাকালো। এবার সে দাঁত বের করে হাসি দিল।

 

‘আফনের কাছে কি দেশলাই হইবো?’ লোকটির চোখ কেমন ছলছল লাগছে।

‘দেশলাই দিয়া কি করবেন?’ অনি এবার ভালই বিরক্ত চোখে তাকায়।

‘একটু ধুমা খামু’

‘কিয়ের ধুমা? বিড়ি এইখানে খাইতে পারবেন না। নার্স দেখলে ঝামেলা আছে।’

‘না না, এইখানে খামু না।’ লোকটির হাত খুব অস্থিরভাবে বিছানায় নড়াচড়া করছে।

‘আফনের না শইল ভাল না, আবার এই শরীলে ধুমা এইসব বিড়ি খাইবেন?’

‘এহন, এট্টু না খাইলে চলবই না।’

‘আমি পারমুনা। দেশলাই নাই।’

 

এই কথা শুনে লোকটির মুখে বর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেল। বাচ্চাদের খেলনার লোভ দেখিয়ে ভাত খাইয়ে সেটা না দিলে যেমনভাবে মায়ের দিকে তাকায়, তেমন চোখের সামনে আশার প্রদীপ নিভে যাওয়া দেখে সে এইভাবেই তাকালো। তবে এতেও অনিন্দিতার জ্ঞান বিতরণ থামলো না।

 

‘আপনের বয়স তো কম না। এই বয়সে বিড়ি ছাইড়া দিতে পারেন না।’

এই কথায় হয়তো লোকটির আতে ঘা লাগলো।

‘আমি বিড়ি খাই না।’

‘তয় কি? আমার বাপের মত হুক্কা খান? আপনেগোর নেশা কিয়ের বুঝিনা, এই যে এত কইরা কই আমার বাপেও হুক্কা ছাড়ে না। ভগবান জানে, কি পায় এর মধ্যে।’

‘হুক্কার মইদ্দে অবশ্য একটা ভাব আছে। সাইজা দিতে হয়।’

 

শুনে অনিন্দিতা শোয়া থেকে বসে পড়লো। লোকটির দিকে ভাল করে তাকালো, তার ময়লা শার্টের ফাকে বুকের যে অংশটা বেরিয়ে গেছে তাতে প্রত্যেকটা হাড় গোনা যাবে ।

 

‘আপনে কি খান কন তো?’ অনিন্দিতা প্রশ্ন করে অবাক হয়ে লোকটির মুখের হাসি দেখছে। সে হাসি শুধু আনন্দের নয়। লোকটি কথার জবাব না দিয়ে বেড থেকে নেমে পড়লো।

কোনমতে লুঙ্গি ঠিক করতে গিয়ে কিছুটা লজ্জায় পড়লো সে, লুঙ্গির একদম মাঝের দিকে একটু ছিড়ে গেছে। কাছ থেকে না দেখলে অবশ্য বোঝা যায় না। অনিন্দিতাও তা দেখেনি লোকটি জানে। তবু মানুষের দূর্বলতার ভয় মানুষই আগে পায়।

 

‘আপনেরে তো এই কয়দিন কেউ দেখতেও আইলো না। কেউ নাই আপনের?’ অনির কন্ঠে কিছুটা শীতলতা।

 

লোকটি এই কথারও জবাব দিতে বোধহয় ইচ্ছুক না। সে সাদাতের বেডেও চোরের মত এখানে সেখানে তাকাচ্ছে।

 

অনিন্দিতা বলল,’ওইহানে কি দেহেন, কইলাম না দেশলাই নাই।’

লোকটি বেডে বসে অনির দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিল।

‘সে আপনের কি হয়? জামাই?’

লোকটির প্রশ্ন শুনে অনিন্দিতা কিছুটা থমকে গেল।

‘সেইটা জাইনা আপনের কি কাম?’

 

লোকটি আবার হাসলো, হাসতে গিয়ে কাশি শুরু হয়ে গেল। কাশির সময় কথা আটকে যাওয়া খুব বিব্রতকর। সে কাশছে সে অনেক চেষ্টা করছে কথাটা বলে ফেলার আর যে শুনছে সে ভাবছে, ‘আহা বেচারা, থাক কিছু বলা লাগবে না।’তবে লোকটি কথা বলেই ফেলল।

 

‘আমার কোন কাম নাই, আপনে খালি রাগেন। আমি কি মন্দ কইছি কিছু?’

‘সে আমার স্বামী হইব ক্যান? সে মুসলমান আমি হিন্দু। সে আমাগো বাড়িত ভাড়া থাকে।’ অনিন্দিতা লোকটার দিকে চোখ বড় করে তাকালো।

 

‘অহ, আচ্ছা। তার পরিবার কই? তাগোরে তো দেখলাম না।’

‘তার পরিবার নাই, সে কাউরে কিছু কয় না।’

‘ও, সেইদিন যে একজন আইলো দেখতে সে ..’

 

অনিন্দিতা এবার ক্ষেপে গেলো, লোকটি বড্ড বেশি কথা বলছে। নেশা চড়ে গেলে এমনটি হয় সে শুনেছে। সে একটা কাপড়ের ব্যগ থেকে দিয়াশলাই বের করে লোকটার বেডে ফেললো।

 

‘আপনের জাইনা কাম নাই। যান আফনে ধুমা খান গিয়া। আজাইরা প্যাচাল পারে খালি…’

 

লোকটা দেশলাইটা হাতে নিয়ে কি যেন দেখছে। একটা দিয়াশলাইয়ের মোড়কে এভাবে কি দেখার আছে তা অনির জানা নেই।

 

‘আমার হালকা গাঞ্জা খাওনের অব্বেশ।’লোকটি অনির দিকে নতুন বরের মত রাজ্যের লজ্জা নিয়ে তাকালো।

‘ছি ছি এই বয়সে..ছি..’ অনি কাল্পনিক অঙ্গভঙ্গিতে চরম ঘৃণা দেখাতে লাগলো।

‘এহন কম খাই। আগে..’

‘আপনের কেচ্ছা আমি হুনবার চাই নাই। যান খাইয়া মরেন।’

‘আমি খাই সুখের লাইগা, মরমু ক্যান?’

‘কিহ?’

 

‘হ। আইজ আমার পোলা আসার কথা। তাই একটু খাইলে মাথাটা হালকা লাগবো।’

‘আপনে হাসপাতালে গাঞ্জা নিয়া আইছেন?’

 

লোকটি আবার হাসতে লাগলো। আর কিছুক্ষণ হেসে আবার কাশি।

‘গাঞ্জা নিয়া ঘুরতে অয় না। দিয়া যায়।’

‘আপনেরে কেডা দিয়া গেল? দেখলামও না।’

‘এহনো দেয় নাই। তয় দিয়া যাবে।’

‘কেডা? আপনে কইলেন কহন তারে?’

 

‘শুনেন, গাঞ্জা খাওয়া মাইনসের একটা আলাদা দুনিয়া আছে। যারা খায় তারা সবাই সবাইরে চিনে। সবখানে পাওয়া যায়, আর চেনা মানুষের বিপদে আমরা যেমন যাই, কারো খাওনের লাইগা দরকার পড়লে তারাও আসে, একদম হাতে দিয়া যায়।’

 

অনিন্দিতা শুনে অবাক হয়ে গেল।

 


(চলবে)

 

উপন্যাসের সবগুলো পর্ব একসাথে:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি চতুর্দশ কিস্তি পঞ্চদশ কিস্তি | ষোড়শ কিস্তি | সপ্তদশ কিস্তি | অষ্টাদশ কিস্তি | উনবিংশ কিস্তি | বিংশ কিস্তি |একুশতম কিস্তি | বাইশতম কিস্তি  | ২৩’শ কিস্তি

  

Share this

Leave a Comment

error: Content is protected !!