রিভালদোর জীবনের গল্প

ব্রাজিলের কিংবদন্তী ফুটবলাদের অতীতের কিছু না কিছু গল্প আছে। যেগুলো হয়তো আপনাকে হাসাবে, নয়তো কাঁদাবে অথবা আপনাকে অনুপ্রানিত করবে।

আজ পাই ফিঙ্গার্স মোটিভেশন এমন এক বাজ্রিলিয়ান কিংবদন্তী ফুটবলারের জীবনের গল্প বলবে, যিনি ব্রাজিলের এক বস্তিতে বেড়ে উঠেছেন আর সংগ্রাম করেছেন চরম দারিদ্যের সঙ্গে। অপুষ্টিজনিত ‘জিনু ভিরাম’ রোগে ভুগেছিলেন যার ফলে হারিয়েছিলেন বেস কটি দাঁতও। ছেলেবেলায় অপুষ্টিতে ভোগা ছেলেটা কালক্রমে বনে যান ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন ফুটবলার। তো চলুন শুরু করি, ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি ফুটবলার রিভালদোর সংগ্রামী জীবনের গল্প। 

রিভালদো ১৯ এপ্রিল ১৯৭২ সালে  ব্রাজিলের পেরেনাম্বুকো প্রদেশের রেসিফে শহরে এক বস্তিতে একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পুরো নাম রিভালদো ভিতর বোরবা ফেরেইরা। সবাই তাকে লিভালদো নামেই চেনেন। ব্রাজিলিয়ান সবার মতই শৈশব থেকে তারও ছিল বিখ্যাত হলুদ জার্সি পরার স্বপ্ন। হয়েছেন ব্রাজিলের সেরাদের একজন। কিন্তু এই খেলোয়াড় কীভাবে হয়ে উঠেছিলেন নিজ দেশের খলনায়ক? চলুন শুরু করি তার শৈশব থেকেই। অসম্ভব দারিদ্র্যের প্রকোপের মাঝে কাটে শৈশব। সমুদ্র সৈকতে পানীয় বিক্রি করতেন হাতে হাতে নিয়ে। অপুষ্টিজনিত ‘জিনু ভিরাম’ রোগে ভুগেছিলেন। এতোটাই অপুষ্টিতে ভুগেছিলেন যে! চোয়াল ভাঙতে ভাঙতে এমন অবস্থায় পৌছে, হারান দুটো দাঁতও। ১৫ বছর বয়সে হারিয়ে ফেলেন বাবাকে, চারিদিকে দেখেন অন্ধকার। এতকিছুর মাঝেও হারাননি ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু ঐ যে, ফুটবল তো ব্রাজিলিয়ানদের রক্তে। পাতলা, লিকলিকে, হাড্ডিসার রিভালদো দিনে ১০-১২ মাইল হেঁটে ট্রেনিং করতে যেতেন, ফিরে এসে আবার ফেরিওয়ালার কাজ।

লিকলিকে একটা তরুণের ফুটবল নিয়ে ছোটাছুটি, মাঠে নানা কারিকুরি তে বিষ্ময় প্রকাশ করতেন অনেকেই; একটা সময় যা নজর কাড়ে সান্তা ক্রুজ নামের একটি ছোট ক্লাবের।  ক্লাবের ডাক্তার বা অনেক কর্মকর্তাই তার শারীরিক সক্ষমতাকে নিয়ে সন্দেহ করে তাকে দলে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। যখন মাঠে নামতেন, রিভালদোকে মাঠের দর্শকরা ‘কুৎসিত হাঁস’ বলে স্লেজিং করতো। সেবার ১৪টি গোল করলেও তাকে রাখেনি সান্তা ক্রুজ, প্রায় পানির দরেই বেচে দেয় মগি মিরিম নামে আরেক ক্লাবে। পারফর্মেন্স মোটামুটি, কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার জন্য তাকে দীর্ঘমেয়াদে কেউ রাখতে চায় না। মগি মিরিমে থাকাকালীন করিন্থিয়ান্সের এক স্টাফের নজরে আসেন তিনি, সুযোগ বুঝে ক্লাব করিন্থিয়ান্স তাকে ধারে নিয়ে নেয় ১৯৯৩ সালে। বড় আসরে নিজেকে মেলে ধরেন তিনি। এবার আর পেছনে ফেরা নয়, স্ট্রাইকার না হয়েও ৩০ ম্যাচে ১১ গোল করেন। করিন্থিয়ান্স তাকে রাখতে চাইলেও তাদেরই প্রতিদ্বন্দ্বী পালমেইরাস তাকে মগি মিরিম থেকে কিনে নেয়। ৪৫ ম্যাচে ২১ গোল করে দুই বছরে ক্লাবকে লিগ সহ তিনটি কাপ জেতান। নজরে পড়েন ইউরোপিয়ান দলগুলোর। স্প্যানিশ ক্লাব দেপোরতিভো তাকে কিনে নেয়।

দেপোরতিভোতে তিনি ছিলেন ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। ইউরোপে এসে প্রথম মৌসুমেই করেন ২১ গোল, তিনিই ছিলেন দলের আসল প্লেমেকার। তার এই অসাধারণ পার্ফমেন্স দেপোরতিভোকে তুলে আনে লীগ টেবিলের চতুর্থ স্থানে। তখনই নজরে চলে আসেন স্পেনিশ জায়েন্ট বার্সেলোনার। ১৯৯৭ মৌসুমে ২৬ মিলিয়ন পাউন্ডে বার্সা তাকে দলে ভেড়ায়। দলে যোগ দিয়েই টানা ৪ বছরের শিরোপা জিততে না পারা বার্সা দলে ৩৪ ম্যাচে ১৯ গোল করে বার্সেলোনাকে চার বছর বাদে লা লিগা ও কোপা দেল রে জেতালেন। স্ট্রাইকার না হয়েও ১৯ গোল, সাথে মারাত্মক সব শ্যুট, স্পিড, বডি ফেইন্ট সব মিলিয়ে ছিলেন যেন এক পরিপূর্ণ প্যাকেজ। 

পরের মৌসুমে ২৪ গোল করে আবারো বার্সেলোনাকে লিগ জেতান তিনি। জিদান, বেকহ্যামদের টপকে জিতে নেন ফিফা বর্ষসেরা খেতাব ব্যালন ডি অর। এরপরই তৎকালীন বার্সার কোচ ভ্যান গালের সাথে তার মনোমালিন্য শুরু হয়। ভ্যান গাল চাইতেন তিনি যেন একদম লেফট উইং ঘেঁষে খেলেন। অথচ তিনি প্লেমেকার, প্রচুর গোলও করেন। রিভালদো রাজি হলেন না। মনোমালিন্য নিয়েও সেবার ১০ গোল করেন। সেই মৌসুমেই ভ্যান গালকে বহিঃস্কার করা হয়। আর নতুন কোচ তাকে তার প্রিয় পজিশনে খেলতে দেন। ২০০১-০২ মৌসুমে বার্সা দেখে এক অতিমানবকে। প্লেমেকার হয়েও ৩৬টি গোল করেন তিনি। তিনি উজ্জ্বল থাকলেও সেবার বার্সা একদমই উজ্জ্বল ছিলো না। লীগের ৫ম স্থানে থেকে তারা মৌসুম শেষ করার কথা থাকলেও শেষ ম্যাচে ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ৯০ সেকেন্ড বাকি থাকতে হ্যাট্রিক করে বার্সাকে জয় এনে দেন ৩-২ গোলে আর বার্সা সুযোগ পায় চ্যাম্পিয়নস লীগ খেলার। 

এর পরের মৌসুমে বার্সেলোনা আবার ভ্যান গালকে আনে কোচ হিসেবে। তাই চুক্তি শেষ হওয়ার এক বছর আগেই তাকে ছেড়ে দেয় বার্সেলোনা। বার্সার হয়ে তিনি ২৩৫ ম্যাচে ১২৯টি গোল করেন। 

এরপরই তিনি ইতালির সিরি এ-এর ক্লাব এসি মিলানের সাথে তিন বছরের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। পরিপূর্ণ এক ক্যারিয়ারে বাকি ছিল কেবল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। মিলানে তিনি ২০০২-০৩ মৌসুমে কোপা ইতালিয়া এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেন। কিন্তু এখানে তিনি ছিলেন অবহেলিত। প্রায় ম্যাচেই তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হত। তাই তিনি এসি মিলান ছেরে দেন।  মিলান ছাড়ার পর, তিনি অল্প সময়ের জন্য ব্রাজিল ফিরে আসেন, বেলো হরিজোন্তে’র ক্রুজিরোতে খেলেন।  এখানে তিনি ১০ ম্যাচে ২টি গোল করে ক্লাব ত্যাগ করেন। 

এরপর ওলিম্পিয়াকোস ক্লাবের হয়ে খেলতে গ্রিসে গেলেন, সেখানেও তিনি ট্রফি জিততে থাকলেন। এরপর আরো অনেক বছর খেলা চালিয়ে গেলেন বিভিন্ন ক্লাবে। 

এবার নজর দেয়া যাক তার জাতীয় দলের পার্ফমেন্সের দিকে। 

১৯৯৩ সালে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে অভিষেক হয় রিভারদোর, ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন তিনি। কিন্তু থিতু হতে পারেননি। এরপরে ১৯৯৬ সালে ব্রাজিলের অলিম্পিক দলে আবারো ডাক পান তিনি। কিন্তু সেই অধোরা অলিম্পিক গোল্ড জয়ের মিশনে রীতিমতো দেশব্যাপী ভিলেইন হয়ে যান রিভালদো। আটলান্টা অলিম্পিকে, ব্রাজিল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় নাইজেরিয়ার, রিভালদোর এক  ভুল পাস থেকে গোল পেয়ে যায় নাইজেরিয়া, দুঃস্বপ্নের ষোলকলা পূর্ণ হয় ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোলকিপারকে একা পেয়েও গোল করতে না পারার মধ্য দিয়ে। এসময় দেশব্যাপী তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। অনেকে তাকে “অপয়া” “ভিলেন” আখ্যা দিতে থাকেন। সেই থেকে শুরু, এরপর ব্রাজিলের সকল ব্যর্থতার প্রাথমিক কারণ হিসেবে তাকেই ধরা হতো!

রিভালদো ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের জাতীয় দলে ডাক পান, সেখানে তিনি ফাইনালে যাওয়ার পথে ব্রাজিলের হয়ে মোট তিনটি গোল করেন, যার মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে ডেনমার্কের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয়ের ম্যাচে দুটি গোল করেন তিনি। ফাইনালে পরাজিত হয় ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে হেরে। 

এমনকি ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ হারার পর তাকে দোষারোপ করা হয় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার জন্য, যার দরুণ ঘরের মাঠে ব্রাজিলের ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ‘বুনো হাস’ স্লেজিং শুনতে হয়েছে রিভালদোকে।

১৯৯৯ সালের কোপা আমেরিকা শিরোপা ধরে রাখা ব্রাজিল দলের সফল অংশিদার ছিলেন। রিভালদো ৫ গোল করে টুর্ণামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। তিনি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।

২০০০ সালের নভেম্বরে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে রিভালদোকে এতটাই টিটকারি দেওয়া হয় যে তিনি দেশের হয়ে খেলা থেকে অবসর নেওয়ার হুমকি দেন।

রিভালদো তার আসল বীরত্বগাথা রচনা করেন ২০০২ বিশ্বকাপ, গ্রুপপর্ব থেকে শুরু করে কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি টানা পাঁচ ম্যাচেই গোল করেন তিনি, রোনালদো-রোনালদিনহোর সাথে গড়ে তুলেন অদম্য নির্ভিক এক আক্রমণভাগ। ফাইনালে ডি-বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নিলেন রিভালদো, জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান ধরতে পারলেন না, ফিরতি শটে গোল করেন রোনালদো। এর কিছুক্ষণ পর রাইট উইং থেকে আসা সহজ একটি পাসকে রিভালদো পায়ের ফাঁক দিয়ে যেতে দিলেন, সামনে থাকা তিন ডিফেন্ডার বুঝেই উঠতে পারেনি, প্রায় ফাঁকায় বল পেয়ে গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপটি জিতিয়ে দিলেন রোনালদো। চিরায়ত এক ব্রাজিলিয়ান ভিলেনই ব্রাজিলকে এনে দিলেন পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা! জাতীয় দল শেষ করেন ২০০৩ সালে। ব্রাজিলের হয়ে তিনি ৭৬ টি ম্যাচ খেলে করেন ৩৬টি গোল। কিন্তু ক্লাব ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে থাকেন। 

দারিদ্র্য তাকে যে খেলা থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি, সেই খেলা এত সহজে ছাড়েননি। ক্লাব ক্যারিয়ার থেকে অবসরে যান ৪৫ বছর বয়সে।

রিভালদোকে তার প্রজন্মের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন এবং সর্বকালের সেরা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের মধ্যে একজন হিসেবে গণ্য করা হয়, তার ড্রিবলিং ক্ষমতা, কৃত্রিম আক্রমণের ব্যবহার, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং বল নিয়ন্ত্রণের জন্য রিভালদো একজন বিপজ্জনক, দক্ষ এবং সৃজনশীল খেলোয়াড় ছিলেন। ডেড-বল বিশেষজ্ঞ রিভালদো তার বাঁকানো ফ্রি কিক এবং পেনাল্টি গ্রহণের পাশাপাশি শক্তিশালী কিকের সাহায্যে দূর থেকে গোল করার দক্ষতার জন্য খ্যাতিমান ছিলেন।

আসলে রিভালদো ছিলেন ১৯৯৬ থেকে ২০০২ পর্যন্ত নিজের সামর্থ্যের চূড়ায়। তার জিদানের মতো মোহনীয়তা ছিল না, রোনালদোর মতো গোলস্কোরিং ছিল না, বেকহ্যামের মতো স্টাইল, স্পিড বা ক্রস ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন এসবের মিশ্রণ, পরিপূর্ণ প্যাকেজ। ভিলেন থেকে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বসেরাদের একজন। তার শৈশবের দারিদ্রতা আর কষ্টই এনে দিয়েছিলেন সাফল্য।  কেমন লাগলো রিভালদোর জীবনের গল্প? কমেন্ট করে জানান। আর পরবর্তিতে আপনি কাকে নিয়ে ভিডিও দেখতে চান সেটিও কমেন্ট করে জানাতে একদমই ভুলবেন না। শুভকামনা আপনার জন্য।

Share this

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top