গ্রিন বুক মুভি রিভিউ

গ্রিন বুক মুভি: আমেরিকান বর্ণবাদের বিশ শতকীয় চেহারা

গ্রিন বুক মুভি: 

 

আমেরিকান বর্ণবাদের বিশ শতকীয় চেহারা: গ্রিন বুক সিনেমা

 নাহার তৃণা


আমেরিকার স্বাধীনতার সনদপত্রে প্রভূত মহৎবাক্য বেশ যত্নের সাথে লেখা হয়েছিল, ‘অল মেন আর ক্রিয়েটেড ইকুয়্যাল’, ‘অল মেন হ্যাভ বেসিক হিউম্যান রাইটস গিভেন টু দেম বাই গড।’ ইত্যাদি’র জোশ কার্যক্ষেত্রে একশ্রেণীর মানুষের জন্য মিথ্যে হয়েই থেকে যায়।

কৃষ্ণাঙ্গ সে জনগোষ্ঠীর সাথে অমানবিক আচরণের এক তামসিক ইতিহাসের জন্ম দিলো আজকে সভ্যতা, মানবিকতা ইত্যাদি নিয়ে বড়াই করা আমেরিকা। দাসপ্রথার মত নিষ্ঠুর রীতির অন্ধকারে তাদের গালভরা কথা, সকল মানুষের সমান অধিকার টধিকার সব চাপা পড়ে গেলো। দূরে দাঁড়িয়ে ‘লাইফ, লির্বাটি, এন্ড পারসুইট অফ হ্যাপিনেস’ আমি কার খালু হয়ে তামাশা দেখতে থাকলো।

‘সে বড় সুখের সময় নয়’, বড় যাতনা উজিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ সেই মানুষগুলোর বেঁচে থাকা। তাদের জন্য চারিদিকেই বাঁধার দেয়াল তুলে দিয়েছে হোয়াইট সুপ্রিমেসি। পথে পথে ছড়ানো হয়েছে কাঁটা। একটা সময় অবশ্য সেই মানুষগুলো নিজেদের অধিকার আদায় করে নিয়েছেন।

মুক্তকণ্ঠে পৃথিবীকে জানিয়েছেন “I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed: ‘We hold these truths to be self-evident: that all men are created equal.” কিন্তু তার আগে অদৃশ্য শেকলে আটকে থাকা এই জনগোষ্ঠীকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। সে পথ বড় যন্ত্রণার, বড় অপমানের।


১৮৬৩তে লিংকন ইম্যানসিপেশন প্রোক্ল্যামেশনের পরেও কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনে মুক্তি আসেনি। তাদের অধিকাংশেরই জমি-জমা ছিল না। ভোটাধিকার ছিল না। শিক্ষা-দীক্ষা-চাকরির ক্ষেত্রে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। সাদাদের চেয়ে বেশি পরিশ্রমের কাজ করেও তারা পেতো কম মজুরি। অবাধ চলাচলে ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। ‘কুকুর আর কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশ নিষেধ’ এমন বিজ্ঞাপনে কেড়ে নেয়া হতো সাদা মানুষের পাশে কালো মানুষের দাঁড়াবার সৌজন্যটুকুও।

স্বগোত্রীয়দের পদে পদে নির্যাতন, অপদস্ত হওয়ার ইতিহাস, নিজেও সে আবর্তে ঘুরপাকে ক্লান্ত, অপমানিত, ভিক্টোর হুগো গ্রিন নামের এক আফ্রিকান আমেরিকান পোস্ট অফিস কর্মী গ্রিন বুক‘ নামে একটি ট্রাভেল গাইড প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এটি কৃষ্ণাঙ্গদের নিরাপদে ভ্রমণ, পথে তাদের জন্য সংরক্ষিত হোটেল রেস্টুরেন্ট ইত্যাদির সলুকসন্ধানের গাইড বুক। প্রথম দিকে এটি ‘দ্য নিগ্রো মটোরিস্ট গ্রিন বুক’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এর প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৩৬ সালে। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত গ্রিন বুক প্রতিবছর নিয়মিতভাবেই প্রকাশিত হয়।

সবার জন্য সমান অধিকারের দেশে এই গাইড ধরে আফ্রিকান-আমেরিকানদের তাদের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চলে যাতায়ত করতে হতো। দেগে দেয়া গণ্ডীর বাইরে গেলেই জুটতো অসহ্য হেনস্থা। উত্তর দক্ষিণের নানান বৈষম্য, দক্ষিণে দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখবার নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত, ইত্যাদি বিষয় ঘিরে দেশটাতে এক পর্যায়ে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সাল ১৮৬১, যুদ্ধ চলে ১৮৬৫ পর্যন্ত।

এই গৃহযুদ্ধে উত্তরের শক্তিশালী ইউনিয়ন সেনাবাহিনী দক্ষিণের বিদ্রোহী কনফ়েডারেটদের বিরুদ্ধে অনেক রক্ত ঝরিয়ে জিতে যায়। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথার আনুষ্ঠানিক উচ্ছেদও করেন। কিন্তু সে বিজয়ের মূল্যবোধটাকে ধরে রাখা ছিল যুদ্ধে জেতার চেয়েও ভয়ানক কঠিন। যার মাশুলের বেশির ভাগটাই গুণে যেতে হয় বিশেষ একশ্রেণীর জনগোষ্ঠীকেই।


সাতানব্বই বছর উজিয়ে ১৯৬২ সালেও ‘গ্রিন বুক’ সিনেমার আখ্যানে দগদগে ঘায়ের মত ফুটে থাকতে দেখি হোয়াইট সুপ্রিমেসির কুআচরণ। কাগজে কলমে যার বিলুপ্তি ঘটে আরো বছর ছয় পরে। আজকের আমেরিকান সমাজ থেকে সেসব এক্কেবারে ধুয়েমুছে ফকফক্কা হয়ে গেছে, এমন দাবী বুকে কিল মেরে একমাত্র মান্যবর ট্রাম্পই করতে পারেন।


‘গ্রিন বুক’ বাস্তব কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র। ডঃ ডন শার্লি একজন আফ্রিকান আমেরিকান বিশ্বমানের পিয়ানিস্ট। যিনি তার কনসার্ট ট্যুরে দক্ষিণের নানা অঞ্চলে পিয়ানো বাজাতে যাচ্ছেন। তার সঙ্গী গাড়ি চালক ইটালিয়ান আমেরিকান টনি লিপ। সদ্য নিয়োগকৃত টনির হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় শর্ত মেনে গণ্ডীকাটা পথ ধরে গন্তব্যে পৌঁছানোর গাইড গ্রিন বুকটি। নিউইর্য়ক শহরের বারের বাউন্সার টনি চাকরি হারিয়ে প্রায় পাকে পড়েই আফ্রিকান আমেরিকান শার্লির ড্রাইভারের চাকরিটা নেয়।

গ্রিন বুক চলচ্চিত্র
গ্রিন বুক চলচ্চিত্র

এই জনগোষ্ঠীর প্রতি তার বিরাগ দেখানো হয়েছে ইতোপূর্বে। দর্শককে তাই তটস্থ থাকতে হয় পথে না জানি কী কাণ্ড ঘটে এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের মানুষের মধ্যে। কাহিনি ঘটে বটে। নানান সব কাহিনির জন্ম দিতে দিতে টনি ডঃ শার্লিকে পৌঁছে দিতে থাকে তার কনসার্ট ভেন্যু গুলোতে। সেইসব কাহিনীর কিছু কিছু টনির সাথে সম্পর্কিত হলেও অধিকাংশই ঘটে ডন শার্লির জন্মগত গাত্রবর্ণ জনিত কারণে।

সেসব ঘটনা বাস্তবক্ষেত্রে যে মানুষটার সাথে ঘটেছিল, তার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, মার্জিত আচরণের প্রতি দর্শকমাত্রই শ্রদ্ধায় নত হবেন। কতভাবেই না দর্শক ডন শার্লিকে অপমানিত হতে দেখেন। ড্রাইভার টনি যথা সম্ভব ঘটনা মোকাবেলায় শার্লির পাশে পাশে থাকে। সময়ে সময়ে অকপট, অমার্জিত-রুক্ষ টনি ঘটে যাওয়া অপমানের উগ্র জবাব দেয়ার পক্ষপাতী হলেও শার্লি ‘যতই হানিবে হেলা ততই সাধিব’র নিজস্ব গণ্ডী থেকে নড়েননি তেমন।


নামকরা রেস্তোঁরায় কনসার্ট উপলক্ষে যাওয়া শার্লির জন্য স্টোর রুম বরাদ্দ, শ্বেতাঙ্গ অভিজাতদের কৃষ্ণাঙ্গ শার্লির বাদন শোনায় সমস্যা না হলেও তাকে নিজেদের টয়লেট ব্যবহার করতে দিতে আপত্তি, শ্বেতাঙ্গ দোকানে ঢুকে নিজের জন্য পছন্দ করে কোট কিনতে চাওয়ায় ব্যর্থ হওয়া, হাইওয়েতে গাড়ি থামিয়ে পুলিশি হেনস্তার জবাবে গরম মাথার টনি নিজেকে ঠিক রাখতে ব্যর্থ হওয়ার ফলশ্রুতিতে দু’জনেরই হাজতে যাওয়া; ইত্যাদি টুকরো টুকরো ঘটনাগুলো এতদিন পরও যে কোন নির্বিরোধী মানুষের মস্তিষ্ক উত্তপ্ত করতে যথেষ্ট। অথচ ভুক্তভোগী ডন শার্লি, চোখের পানি গোপন করে নিজের মুখে সভ্য মানুষদের দেয়া আঘাতের চিহ্ন লুকোতে সযত্নে লাগান মেকাপের প্রলেপ!  


একবারই শার্লির তীব্র রাগের প্রকাশ দেখবেন দর্শক। যখন নামকরা রেস্তোঁরায় কনসার্টে উপস্হিত শার্লি কর্তৃপক্ষের অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হন। কনসার্টের জন্য তৈরী হয়ে তিনি রেস্তোঁরার দিকে এগিয়ে দেখেন, ভেতরের সাজানো টেবিলে সবাই যে যার মতো বসে খাওয়ায় ব্যস্ত। এমন কী তার সঙ্গী টনি ও বাদক দু’জনও টেবিলে খেতে বসে গেছে। অথচ তাকে রেস্তোঁরার দরোজাতেই আটকে দেয়া হলো কৃষ্ণাঙ্গ হবার অপরাধে।

যে শিল্পী ওই সন্ধ্যায় প্রায় সাড়ে চারশ দর্শক-শ্রোতার সামনে তার যাদুকরী সুরের মুর্ছনা ছড়াবেন বলে প্রস্তুত, সেখানে স্বয়ং তাকেই খেতে দেবার ব্যাপারে চরম অমানবিক আচরণ! এই কুৎসিত বৈষম্যটি শার্লি বরাবরের মতো চুপচাপ মেনে নিতে ব্যর্থ হন। টনিও তাতে যথেষ্ট ইন্ধন যোগায়, যা সঙ্গতই ছিল। সপাটে অভিমানী শিল্পীটি জানিয়ে দেন- থাকলো তোমার রেস্তোঁরা, থাকলো কনসার্ট। আমি চললাম। মনে মনে দেয়া দর্শকের তুমুলু হাততালির মুখরতা পেরিয়ে বেরিয়ে যান শার্লি আর তার সঙ্গীরা।

এমন নানান ঘটনার অভিজ্ঞতার সাথে সাথে দর্শক পলকহীন ভাবে দু’জনের দুর্দান্ত অভিনয়ের পাশাপাশি সাক্ষী হতে থাকেন অনন্য সব অনুভূতির। সেসবের ঘায়ে কখনও দর্শক হো হো হাসিতে ফেটে পড়বেন। কখনও রাগে ক্ষোভে আজকে সবকিছুতে বাহাদুরি করা আমেরিকাকে ধিক্কার দেবেন।

গ্রিন বুক সিনেমার দৃশ্য
গ্রিন বুক সিনেমার দৃশ্য

মানুষ হয়ে অন্য মানুষের নিদারুণ অপমানে মন-চোখ দুটোই ভিজে উঠবে মাঝে মাঝেই। আবার টনির লক্ষী বউয়ের চিঠিতে ডুবে গিয়ে ভাববেন, ভাগ্যিস ডোলোরেস স্বামীকে বলেছিল, “তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, জানিও, পত্র দিও।”

গ্রিন বুক সিনেমায় কি নেই আসলে! রাজনীতি, অর্থনীতি, বন্ধুত্ব, বর্ণবিদ্বেষ, প্রেম, একাকীত্ব, চিঠিরকাল, ফ্রাইডচিকেন, ডন শার্লির অসাধারণ বাদন, গোপন করার শিল্পিত প্রকাশ, নিজেকে আবিষ্কারের এক অসাধারণ সেলুলয়েডীয় উপস্হাপন গ্রিন বুক। অথচ আঙ্গুল তুলে পই পই করে জ্ঞান দিচ্ছি টুকে নেও’য়ের ঝোঁক দেখা যায়নি কোত্থাও!


টনি লিপ/ভিগো মর্টেনসেন(Viggo Mortenson), ডঃ ডন শার্লি/মাহেরশেলা আলী(Mahershala Ali), দু’জনের অনবদ্য যুগলবন্দী অনেকদিন মনে থাকবে। টনির স্ত্রী চরিত্রে সুন্দরী, বুদ্ধিমতি লিণ্ডা কার্ডেলিনি‘র(Linda Cardellini) অভিনয়ও মন ছুয়ে যায়..। শেষদৃশ্যে শার্লির কানে কানে চিঠি সংক্রান্ত গোপন কথাটা বলে নেবার ভঙ্গিটা ভারী মনকাড়া!

যাত্রাপথে বিগড়ে যাওয়া গাড়ি মেরামতে ব্যস্ত টনি, গাড়ি থেকে নেমে বাইরে এসে দাঁড়ান শার্লি। কিছুটা দূরেই হতভাগ্য কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা মাঠের কাজে ব্যস্ত। একটু পর তাদের মধ্যে থেকে একজন, দু’জন করে প্রায় সবাই, ঝাঁ চকচকে পোশাকের শার্লিকে তাকিয়ে দেখছে; তারা অবাক হয়ে দেখছে একজন কালো মানুষের সাদা ড্রাইভার! তাদের বিস্ময়মাখা দৃষ্টি, শার্লির অস্বস্তি লুকানোর প্রাণপণ চেষ্টা আর ক্ষ্যাপাটে টনির না বোঝার প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সেখান থেকে চলে যাবার এপিক দৃশ্যটি অনেকদিন মন আঁকড়ে থাকবে।


পরিচালক পিটার ফ্রারেলি(Peter Farrelly)’র পরিমিত বোধের প্রশংসা না করলেই না। ‘গ্রিন বুক’ নামের এই অপূর্ব উপহারের জন্য পিটার ফ্রারেলি ও তাঁর টীমের সবাইকে টুপি খোলা অভিনন্দন!


আরও পড়ুন:

ইরাক আমেরিকা যুদ্ধের গোপন কাহিনী নিয়ে সিনেমা গ্রিন জোন(২০১০)

ইতিহাসের সেরা ৫টি নিষিদ্ধ চলচ্চিত্র

এক অপ্রশংসিত প্রেমের চলচ্চিত্র লায়লা মজনু’র গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!