যখন থামবে কোলাহল

ধারাবাহিক উপন্যাস: যখন থামবে কোলাহল- মারুফ ইমন | ১৫’শ কিস্তি

মারুফ ইমনের ধারাবাহিক উপন্যাস যখন থামবে কোলাহল:


আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি | চতুর্দশ কিস্তি | ১৫’শ 


যখন থামবে কোলাহল

(১৫’শ কিস্তি)


সাদাতের সামনে যে মেয়েটি বসে আছে তাকে যথেষ্ট রূপবতী বলাই যায়। বয়স খুব বেশি না হলেও পঁচিশের কম না। সারা শরীর কালো বোরকায় ঢাকা, মুখ পা আর হাতের কিছু অংশ খোলা। সাদাত মেয়েটির পায়ের দিকে তাকালো, মেয়েটির পা দুধে আলতা। মেয়েটি বুঝতে পেরে পা সরিয়ে নিলো চেয়ারের পায়ার আড়ালে।

সাদাতের দাদীর কথা মনে পড়ছে, পা দেখেই নাকি মেয়ে চিনতে হয়। যে মেয়ের পা যত ফর্সা, সে পুরো শরীরে তার চেয়েও ফর্সা হবার কথা। পায়ে বড় বড় নখ থাকা মেয়েরা নোংরা হয়, সংসারেও ততটা পরিচ্ছন্ন হয় না। অনেকের পা ফাটা থাকলে নাকি তার দুরন্তপনা থাকে বেশি, তাকে দিয়ে স্বামীর সেবা করানো কঠিন।

সাদাত আপাতত পা নিয়ে কোন গবেষণায় যাচ্ছে না। এতক্ষণ ধরে মেয়েটা কোন কথা না বলে চুপচাপ বসে আছে, একটা শব্দও করেনি। কেউ দেখে বলবে না, মেয়েটির স্বামী খুনের আসামী হয়ে থানা হাজতে আছে। সাদাতের থাকার দোতলার ঘরের সামনের বারান্দায় একটা টুলে তাকে বসতে দেয়া হয়েছে।

তবে বেশিক্ষণ বসে থাকার মত শক্তি সাদাতের নেই এখন। তার মেরুদণ্ড বরাবর মারাত্নক ব্যাথা করছে। তাছাড়া মেয়েটি কি বলবে তা মোটামুটি সে আন্দাজ করতে পারছে, তাই আগ্রহও কম। সাদাত থানা থেকে একটু আগেই ফিরেছে, ওসি আপেল সাহেবের ফাইল করা শেষ। ঢাকা থেকে দুটো ফোন এসেছিল, তাতেই দফারফা অবস্থা তার। নাকে মুখে কাজ করেছে সে। বলা যায়, আজগরের ভাগ্য এখন সাদাতের অফিসিয়াল স্ট্যাটমেন্টের ওপর ঝুলে আছে।

 

পানির গ্লাস হাতে অনিন্দিতা আসলো, তাকেও ক্লান্ত দেখাচ্ছে অনেক। কাপড়ের খানিকটা ছিড়ে গেছে আঁচলের দিকে, রঙও উঠে গেছে বোঝা যায়। সে কপালের ঘাম মুছে পানির গ্লাসটি এগিয়ে দিল মেয়েটির দিকে, ‘তোমার পোলারে চিড়া খাইতে দিছি, বুঠার সাথে বইসা আছে।’

তারপর একবার সাদাতের দিকে আরেকবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেয়ালের দিকে সরে গেল।

‘শরিফা আপনারে কিছু বলে নাই, না?’ অনিন্দিতা চেহারায় একটা সংকোচ এনে বলল। তার মনে হয় এই প্রশ্নটি করা ঠিক হয়নি, করে এখন সে অনুতপ্ত। সাদাত মাথা নাড়ালো।

অনি মেয়েটির দিকে নুইয়ে মাথায় হাত রাখতেই সে মাথা তুলে তাকালো। ওর চোখগুলো লাল, হয়তো সারারাত কান্নাকাটি করেছে।

সাদাত এবার কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলল, আমার একটু ঘুমাতে হবে, আপনি কিছু বললে বলতে পারেন।

শরিফা অঝোরে কান্না শুরু করলো। কিছুই বলছে না।

অনি বলল, ‘আজগর কেন এইরকম করলো আমি বুঝতেছি না। কি সুন্দর সংসার, বাচ্চাটাও এখনো ছোট।’

সাদাত আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল। তার আগেই মেয়েটি বলল, ‘আমি কিছুই চাইনা। আপনেরে দুইটা কথা বলতে আসছি, বইলা চইলা যাবো। একটু শুনেন।’

সাদাত কাশি দিল, বুকে বোধহয় দুদিনের ঠাণ্ডায় কফ জমে গেছে। আরেকবার কাশি দিতেই বুকে খুব ব্যথা করে উঠলো। অনিন্দিতা এখনো দাড়িয়ে আছে, তারও শরীফার কথা শোনার আগ্রহ।

শরিফা তার চোখ বোরকার এক কোণা থেকে হাত বের করে একটা ন্যাকড়া মতন কাপড় দিয়ে মুছলো, এরপর সাদাতের দিকে তাকাতেই দেখা গেল সেই এক জোড়া চোখ লাল টকটকে হয়ে কি গভীর আকুতি নিয়ে তাকিয়ে আছে। সে বলতে শুরু করলো..

‘আমার চাইর বছর বয়সের সময় আম্মা মারা গেছে, আব্বার কাছে বড় অইছি, আর কোন ভাইবোন আত্নীয় পরিজন কেউ নাই, থাকলেও কহনো দেখি নাই বাড়িতে আসতে। আব্বা কুরান শরীফের হাফেজ আছিলেন, সারাবছর এলাকার মসজিদের বারিন্দায় পোলাপানরে পড়াইতেন কুরান শরীফ। কি সোন্দর, নূরানী ছিল তার চেহারা, আমি নাকি তার চেহারা পাইছি সবাই কইতো। মসজিদের একটু পাশে একটা ছোট ঘর তুইলা আমরা থাকতাম, খাওনের কোন ঠিক ছিল না, এলাকার অনেক বাড়ি থেইকা খাওন আসতো। আর ঘরে কিছু থাকলে আব্বাই রানতেন আমি বুঝ হবার আগে। উনার রান্নার হাত আবার জবর, আমারে এক দূর সম্পর্কের দাদীর হালতে রাইখা সে তাবলিগে চইলা যাইত, বলতো আল্লাহর কাছে রাইখা গেলাম তার বান্দীরে। তাই আমি একলাই অনেকটা সময় থাকতাম, মহিলাদের তালিমে যাইতাম। পর্দা করতাম বুঝ হইবার আগের থেইকাই। আব্বা সব মানতেন, কহনো মাইয়া মাইনসের শইল্যে কাপড় কম থাকবে এইটা মানতেন না। একবার আমি একটু মাথার চুল খুইলা দোকানে গেছি তেল আনতে, বয়স বারো তের হইবো। আব্বা দেখতে পাইয়া বাসায় আইসা আমার গালে একটা চড় দিলেন। আমি মাথা ঘুরাইয়া পইড়া গেলাম। আব্বা কান্দন শুরু করলো, পাশের ঘরের আরেক মাইয়ারে ডাইকা আনলো।’

এইটুকু বলে শরিফা মাথার কাপড়টা টেনে বসলো। সাদাত কেন যেন জমে যাচ্ছে একেবারে। বাইরে যথেষ্ট রোদ হলেও বারান্দার অংশটুকু ঠাণ্ডা, একটু না বেশ ঠাণ্ডা। তবে তার চেয়েও সে জমে গেছে শরিফার কথায়। একটু পানি গিলে শরিফা আবার বলতে লাগলো…

‘আমারে সবাই ধরাধরি কইরা হাসপাতালে নিয়া গেল। আব্বা পরথম চায় নাই, পরে আমার অবস্থা দেইখা একটা ভ্যানে তুইলা দিলো, সাথে দুইজন পতিবেশী ভাবী। আব্বা পেছনে আরেক ভ্যান নিয়া আসতেছিল।

হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফিরে সইন্দাবেলা। আব্বা আমার মাথার কাছে বইসা কান্না শুরু করলেন। কইলেন, তোমার মায়ের গায়ে একবার খুব রাগে হাত তুলছিলাম, তুমি তখন কোলে। সে কি কান্দন, মনে হয় তার বুক ফাইটা শেষ। পরে আমার এত মায়া হইলো, নিজেরে রাস্তার কুত্তার লাহান মনে অইলো। দুইদিন হয়া যায়, তার কান্দন থামে না, খাওন ও খায় না। আমি তারে বললাম, আর কোনদিন এমন  হইবোনা। সে কি কইলো জানো? কয়, আফনে আমার স্বামী, আমারে মারতেই পারেন। তয় আমার মাইয়ার গায়ে কোনদিন হাত তুইলেন না, তারে বুঝাই কইবেন। সে আমার হাতটা ধরে কথা নিলো। শরীফা, তোমার মায়েরে দেয়া কথা রাখতে পারলাম না। তয় তোমারে একটা নেককার পোলার লগে বিয়া দিমু, সে তোমারে কোনদিন মারবে না। দেইখো।

আব্বার কথা শুইনা আমার লজ্জাও লাগলো আবার কান্দনও আসলো। কেমুন যেন একটা মনের মইধ্যে লাগে এর পর থেইকা। যেই পোলারেই দেখি আব্বার সাথে মনে হয়, এর লগেই মনে হয় আমারে… তয় আব্বা এই কথাও রাখতে পারলেন না। আমার বিয়া হইলো এক বেনামাজী বদ লোকের সাথে। ভাই একটু শুনেন, উনার সাথে আমার বিয়া নিয়াও একটা ঝামেলা ছিল।’

সাদাতের দুই চোখে রাজ্যের ঘুম এসেছিল, কিন্তু এখন সেগুলো উধাও। শরীফার গল্প, এসব বিয়েশাদীর ইতিহাস তাকে বলার কারণ সে ধরতে পারছে না। শরীফা কি কোন মাইণ্ডগেম খেলছে তার সাথে?

কিছুটা বিরক্তি নিয়ে সাদাত বলল, ‘আপনি বলে যান। আমি শুনছি। আর পারলে একটু ছোট করে বলেন।’

শরীফা আবার শুরু করলো…

‘সেইদিন সকালে আব্বা ফজর পড়ে একটু শুইতে যাবেন, আমি নাস্তার জন্যে গরম পানি বসাইছি। আমাদের ঘরের সামনে একটা পুরনো লোহার ছোট গেটের মত ছিল। গেটে ঠাস ঠাস শব্দ। আব্বা আর আমি দুইজনেই আচানক হইলাম। আব্বায় জিগায়, দরজায় কেডা? কেউ কথা কয় না। আবার জিগায়, বাইরে থাইকা কয়, হুজুর আমি আজগর। আব্বা কয়, আজগর ! এত বিহানে? কি ঘটনা? বাইরের লোকে কয়, একটু খুলেন। সমস্যা ছিল। আব্বা বাইর হইলেন। অনেকক্ষন সময় চলে গেলো। আমি আটা গুইলা রুটি বানাইলাম, আব্বা আসে না। পরে একটু ডর লাগতেছিলো। আব্বা আসলেন দুপুরবেলা।

তার মুখ খুশিখুশি লাগে, আমি নাস্তা দিলাম। বলল, খাইয়া আসছি মা। তোমার বিয়ার কথাবার্তা সাইরা আসলাম।

আমি কেমন যেন ডরাই গেলাম। বললাম, কি বলেন আব্বা, এহন বিয়া? আমি গেলে আপনেরে দেখবো কে? আব্বায় হাসলো।’

শরীফা নিজেও কথাটা বলে একটু মুচকি হাসি দিল। বিয়ের ব্যপারে অনেক মেয়ের অনেক অভিজ্ঞতা সাদাত জানে। মেয়েরা নিজের বিয়ের ব্যাপারে প্রথম যেদিন শোনে এরপর থেকে তার নিজেই মধ্যেই কেমন যেন একটা শৃঙ্খলভাব নিয়ে আসে। কথা কম বলে, লোকের সামনে কম যায়, ছোটদের কোন ব্যাপারে মাতুব্বরী করে। মায়ের সাথে এসময় অনেক কাজ শিখতেও দেখা যায়। শরিফাও হয়তো তেমন ছিল। তাকে এখন আগের মত ক্লান্ত লাগছে না, অনিন্দিতা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। একমনে এমনভাবে শুনছে যেন সে আজই শরিফাকে প্রথম দেখলো। শরিফা বলতে লাগলো আবার…

‘আব্বা বলল, তুমিই আমারে দিনে দুইবার আইসা দেইখা যাইতে পারবা। শুইনা আমার মনে হইলো এটা কেমনে সম্ভব। আব্বা বলল, ছেলে ভাল, পাশের পাড়ার। তার মা আমারে ডাইকা নিছে, তোমারে নাকি তালিমঘরে দেখছে, পছন্দ হইছে।

আমি শরম পাইয়া ঘরে গেলাম। আব্বা বলল, বিয়াশাদী আল্লার একটা বড় ইচ্ছা, আমাদের কারো হাত নাই। ছেলের নাম আজগর, মক্তবে ওরে পড়াইতাম, শান্ত শিষ্ট ছেলে। তবে পড়াশুনায় মন নাই, তেলের ব্যবসা করে। তয় ওর আম্মার সাথে কথা বইলা ভাল্লাগছে। এমন শাশুড়ি পাওয়া খারাপ না।

আমি ঘর থেকে হু হু করলাম শুধু। আব্বা ঘরে ঢুকলেন, আমি শরমে মুখ ঢাকলাম। নিজের বাপের কাছে এমন শরমে কোনদিন পড়ি নাই এর আগে। আব্বা মাথায় হাত রাইখা কইলেন, আমি বিচার বিবেচনায় বিয়া একরকম ঠিক করেই ফেলছি তোমারে না জানাইয়া, আমার বিবেচনা ভুল ও হইবার পারে। তোমার কোন কথা থাকলে কইতে পারো। আমার কিছু কওনের ছিল না। আর তারা কোন টাকা পয়সা বা লেনদেন চায় নাই, শুধু মেয়ে চায়। আমি শরমে মাথা নাড়লাম। এক ঝড়বৃষ্টির রাইতে উনার সাথে আমার বিয়া হইলো। সেই রাত যে এত কষ্টের হইবো বুঝতে পারি নাই। বিয়ার রাত হয়ে গেল মরণের রাত।’

বলেই শরিফা আবার কান্না শুরু করলো। সাদাত চেয়ারের হাতল ধরে মাথাটা এলিয়ে দিল, তবু সে অপেক্ষায় আছে পরের কথাটুকু শুনতে, অনিন্দিতাও বারান্দা দিয়ে একবার নিচে তাকিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে এল।


(চলবে)

 

উপন্যাসের সবগুলো পর্ব একসাথে:

প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি | তৃতীয় কিস্তি চতুর্থ কিস্তি | পঞ্চম কিস্তি | ষষ্ঠ কিস্তি | সপ্তম কিস্তি | অষ্টম কিস্তি | নবম কিস্তি | দশম কিস্তি | একাদশ কিস্তি | দ্বাদশ কিস্তি | ত্রয়োদশ কিস্তি চতুর্দশ কিস্তি ১৫’শ 

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *