ওয়ারেন বাফেটের জীবনী

ওয়ারেন বাফেটের জীবনী

পৃথিবীর সেরা বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের জীবনী | জীবনের গল্প

ওয়ারেন বাফেটের জীবনী:    

বিংশ শতকের সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের জীবনী

 


কে এই ওয়ারেন বাফেট?


অনেকে আছেন যারা পড়াশোনা করে চাকরি করার থেকে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হতে বেশী আগ্রহী। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব এবং নানা পারিপার্শ্বিক কারণে তাদের স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই রয়ে যায়।

তবে পৃথিবীতে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে করে যান নিরলস প্রচেষ্টা। তাই সফলতাও তাদের দ্বারপ্রান্তে এসে কড়া নাড়ে।

এমনই একজন সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হলেন ওয়ারেন বাফেট। অনেকে তাকে ডাকেন মিরাকল অব ওমাহা নামে।

বাফেট একাধারে একজন মার্কিন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, বক্তা এবং জনহিতৈষী ব্যক্তি। বর্তমানে তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান। ২০০৮ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির তালিকায় প্রথম স্থানে এসে বিশ্বজুড়ে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন এই মার্কিন ব্যবসায়ী।

২০১১ সালে তিনি বিশ্বের ধনী ব্যক্তি হিসেবে লাভ করেন তৃতীয় স্থান। ২০১২ সালে টাইম ম্যাগাজিন বাফেটকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৮ সালে তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯০.২ বিলিয়ন ডলারে। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের তৃতীয় সম্পদশালী ব্যক্তি।

বিখ্যাত ব্যবসায়ী ওয়ারেন বাফেটের সফল হওয়ার গল্প নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত ওয়ারেন বাফেটের সফল হওয়ার গল্পের শুরু এতটা সহজ ছিল না। ব্যর্থতা বারবার এসে তাকে ঘিরে ধরলেও কখনো হার মানেননি তিনি।

আশা করি ওয়ারেন বাফেটের সফল হওয়ার গল্পটি আপনাকে আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে আরো উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে।


ওয়ারেন বাফেটের সংক্ষিপ্ত জীবনী


১৯৩০ সালের ৩০ আগস্ট ওয়ারেন বাফেটের জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের ওমাহাতে। তার বাবা হাওয়ার্ড বাফেট ও মা লিলা বাফেটের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার পুরো নাম ওয়ারেন এডওয়ার্ড বাফেট।

 

শৈশব থেকেই বাফেটের স্বপ্ন ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। তাই অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও অর্থ উপার্জন এবং সংগ্রহের প্রতি ছিল তার দুর্নিবার আকর্ষণ। এক্ষেত্রে লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করা One Thousand Ways to make 1000 Dollar in your spare time বইটি ৭ বছর বয়সী বাফেটকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে।

ফলে অল্পবয়স্ক ওয়ারেন তখন থেকেই হয়ে ওঠেন একজন কর্মশক্তিপূর্ণ উদ্যোক্তা। শৈশবে ওমাহায় বাফেট কিছুদিন তার দাদার মুদি দোকানে কাজ করেন। সেখানে তিনি কোকা কোলা, গলফ বল, স্ট্যাম্প, এমনকি ম্যাগাজিনও মানুষের বাড়ি গিয়ে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতেন।


লেখাটি ভিডিও থেকে দেখুন


ওয়ারেন বাফেটের পড়াশোনা শুরু হয় রোজ হিল এলিমেন্টারি স্কুলে। ১০ বছর বয়সে বাফেট নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ দেখতে নিউ ইয়র্ক সিটিতে আসেন। বাফেটের বয়স যখন মাত্র ১১ বছর, তখন তিনি প্রথম নিজের জন্য তিনটি শেয়ার ক্রয় করেন।

১৯৪২ সালে বাফেটের বাবা কংগ্রেসে নির্বাচিত হলে সপরিবারে তারা ওয়াশিংটন ডিসি তে চলে আসেন। সেখানে তিনি ভর্তি হন অ্যালিস ডিল জুনিয়র হাই স্কুলে এবং পাস করেন উইলসন হাই স্কুল থেকে। হাই স্কুলে থাকাকালে তিনি তার বাবার কিছু সম্পত্তি বিনিয়োগ করে ৪০ একরের একটি খামার কেনেন।

হাই স্কুলের পড়া শেষে তার সঞ্চয় ছিল প্রায় ৯,৮০০ ডলার। ১৯৪৫ সালে ১৫ বছর বয়সী বাফেট একটি পিনবল মেশিন কিনে এক নাপিতের দোকানে রাখেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি কিনে ফেলেন একই রকম আরো কয়েকটি মেশিন। এভাবে কিশোর বয়সেই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।

১৯৪৭ সালে বাফেট ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়াতে ভর্তি হন। সেখানে প্রায় ২ বছর পড়াশোনা করার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা-লিঙ্কন থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক পাস করেন।

বাফেটের স্বপ্ন ছিল হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে পড়াশোনা করার। কিন্তু সেখান থেকে তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। তবুও থেমে যাননি বাফেট। ১৯৫১ সালে কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি।

ওয়ারেন বাফেটের আদর্শ ছিলেন বিখ্যাত ইনভেস্টার বেঞ্জামিন গ্রাহাম। বাফেট ওয়াশিংটনে গিয়ে গ্রাহামকে খুঁজে বের করেন এবং তার সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু এখানেও তাকে না শুনতে হয়।

এই সময় তিনি উপলব্ধি করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনভেস্টমেন্ট হল নিজের উপর ইনভেস্ট করা। তাই বাফেট নিজেকে আরো দক্ষ করে তুলবেন বলে ঠিক করেন।

বাফেটের মাঝে জনসমক্ষে কথা বলার ভয় কাজ করত। তার এই ভীতি দূর করতে তিনি ডেল কার্নেগীর বিখ্যাত কোর্স করেন। ফলে তিনি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা-ওমাহাতে Investment Principles এর উপর ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। যেখানে ক্লাসের অধিকাংশই ছিলেন তার দ্বিগুণ বয়সী।  

একই সাথে ১৯৫০ সালে বাফেটের বয়স যখন ২০ বছর, তখন তিনি ওমাহাতে সিঙ্কলেয়ার টেক্সাকো নামের একটি গ্যাস স্টেশনে ইনভেস্ট করেন। কিন্তু সেখানেও তিনি ব্যর্থ হন। তবে ব্যর্থতা কখনোই তাকে তার স্বপ্ন পূরণ করার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

১৯৫১-৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি বাফেট ফক কোম্পানিতে বিনিয়োগ কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি তার আদর্শ বেঞ্জামিন গ্রাহামের সাথে গ্রাহাম নিউম্যান কর্পোরেশনে নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে চাকরি শুরু করেন। এসময় তার প্রাথমিক বেতন ছিল ১২,০০০ মার্কিন ডলার।

১৯৫৬ সালে বাফেট তার ব্যক্তিগত সঞ্চয় ১,৭৪,০০০ ডলার দিয়ে বাফেট পার্টনারশিপ লিমিটেড নামে ওমাহাতে তার প্রথম প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে তার অংশীদার ব্যবসা ছিল ৩ টি এবং ১৯৬০ সালে তার অংশীদার ব্যবসা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭টিতে।

নিজের চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ তিনি ১৯৬২ সালে একজন মিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠেন। এসময় তার অংশীদার ব্যবসায় ৭১,৭৮,৫০০ ডলার মুনাফায় তার নিজস্ব অর্থের পরিমাণ ছিল ১০,২৫,০০০ ডলারেরও বেশি।

পরবর্তীতে তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে নামের একটি তৈরি পোশাক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু ব্যবসা সফল না হওয়ায় তিনি বীমা ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৭৩ সালে বাফেট ওয়াশিংটন পোস্ট কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করেন এবং কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরস এর সদস্য হন। ১৯৭৭ সালে বাফেটের বার্কশায়ার কোম্পানি ৩২.৫ মিলিয়ন ডলারে বাফেলো ইভিনিং নিউজ কোম্পানি কিনে নেয়।

এরপর ১৯৮৭ সালে বাফেট সলোমন ইনকর্পোরেটেডের ১২ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়ে কোম্পানির ডিরেক্টর হন। ১৯৮৮ সালে তিনি কোকা-কোলা কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করা শুরু করেন এবং প্রায় ১.০২ বিলিয়ন ডলারে কোম্পানিটির ৭ শতাংশ শেয়ার কিনে নেন।

১৯৯০ সালে বাফেট হয়ে ওঠেন বিলিয়নিয়ারদের একজন। এরপর ১৯৯৯ সালে তার কোম্পানি জেনরি নামের এক বীমা কোম্পানি ক্রয় করে।

২০০২ সালে বাফেট অন্যান্য মুদ্রার বিনিময়ে প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরবরাহ করার চুক্তিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হন এবং ২০০৬ সালে এই চুক্তির মাধ্যমে তার অর্জন ছিল ২ বিলিয়ন ডলারের উপর। একই বছর তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের ৮৫ ভাগ শেয়ার ৫টি ফাউন্ডেশনকে দিয়ে দিবেন বলে ঘোষণা করেন।

২০০৮ সালে বাফেট বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির হিসেবে পরিণত হন। এ সময় ফোর্বস অনুযায়ী তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ৬২ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তার সম্পদ ২৫ বিলিয়ন ডলার হ্রাস প্রায়। ২০১২ সালে বাফেট জেনারেল নামের মিডিয়া কোম্পানিটির স্বত্ত কিনে নেন। সে বছর এটি ছিল তার ক্রয়কৃত ২য় সংবাদপত্র কোম্পানি। ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে প্রকাশিত ৬৩ টি সংবাদপত্রের মালিক হন।  


ব্যক্তি হিসেবে বাফেট


১৯৫২ সালে ওয়ারেন বাফেট সুসান থম্পসনকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে রয়েছে তিন সন্তান- সুসান এলিস, হাওয়ার্ড গ্রাহাম ও পিটার এন্ড্রু। ২০০৪ সালে সুসান মারা যাওয়ার পর ২০০৬ সালে বাফেট তার দীর্ঘদিনের পরিচিত অ্যাসট্রিড ম্যাঙ্কসকে বিয়ে করেন।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় নাম উঠলেও বাফেট জীবনযাপন পদ্ধতি অত্যন্ত সাধারণ। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৩১,৫০০ ডলার দিয়ে কেনা বাড়িতে এখনো বাস করেন তিনি। এমনকি তার বাড়ির চারপাশে কোনো আলাদা প্রাচীর নেই।

বাফেটের অনলাইনের ব্রিজ গেমসটি বেশ পছন্দের। প্রায়ই তিনি বিল গেটসের সাথে ব্রিজ খেলে থাকেন। তবে তিনি একজন ফুটবলপ্রেমীও বটে। নেব্রাস্কা ফুটবলের ভক্ত তিনি। ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও তিনি ফুটবল খেলা দেখার জন্য সময় বের করেন। এছাড়া বাফেট প্রতিদিন প্রায় ৫টি সংবাদপত্র পড়েন।

ওয়ারেন বাফেট একজন সফল উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী হওয়ার পাশাপাশি একজন প্রখ্যাত জনহিতৈষী ব্যক্তি। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় তিনি দান করেছেন প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও তিনি তার সম্পত্তির ৯৯ ভাগ জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য দান করবেন বলে অঙ্গীকার করেন।

ওয়ারেন বাফেটের স্বপ্ন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সফল স্টক মার্কেট ইনভেস্টরদের একজন হয়ে ওঠার।

তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস আর অধ্যবসায়ের বলেই তিনি তার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে সক্ষম হন। তার সফলতার গল্পটি নিঃসন্দেহে মনে অনুপ্রেরণা যোগায়। ওয়ারেন বাফেটের বিখ্যাত উক্তি সব সময় তরুণদের প্রচণ্ড প্রভাবিত করে।


ওয়ারেন বাফেটের জীবন কাহিনী নিয়ে আপনার মতামত জানান 


আরও বিখ্যাত মানুষের জীবনী বা জীবনের গল্প পড়ুন:

স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী

গড অফ ক্রিকেট শচীন টেন্ডুলকার

জেফ বেজস: শূন্য থেকে কীভাবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ই-কমার্স সাইট অ্যামাজন

সুন্দর পিচাই, ভারতের সাধারণ একটি পরিবার থেকে কীভাবে আজ গুগলের CEO?

 

 

Share this

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!