শাহরুখ খানের জিরো সিনেমা নিয়ে একরাশ হতাশা

শাহরুখ খানের জিরো সিনেমার রিভিউ: 

| শাহরুখ খানের জিরো সিনেমা নিয়ে একরাশ হতাশা |


 

তরুণ আদর্শ জিরো চলচ্চিত্রের মুক্তির দিন তাঁর টুইটার পেজে লেখলেন ‘Fiasco’। যার সহজ সরল বাংলা হলো চরম ব্যর্থতা। শুরু অনেকটা শক্ত হলেও শেষের খিচুড়ি এই চলচ্চিত্রকে বছরের সবচেয়ে হতাশাজনক চলচ্চিত্রের একটি বানিয়েছে।

শুক্রবার যখন বলিউডের বিখ্যাত এই ফিল্ম ক্রিটিক এরকম রায় দিলেন তখন আমি চিন্তা করলাম আমি এই চলচ্চিত্রটি দেখব এবং যেহেতু কিং খানের চলচ্চিত্র সেহেতু অবশ্যই আমি নিরাশ হবো না।

ভয় না পাওয়ার আরেকটি কারণ ছিল। সে কারণটি হিমাংশু শর্মা এবং আনন্দ এল রায়ের জুটি। এই জুটি এক সাথে তিনটি টানা হিট ফিল্ম দিয়েছেন এবং সেগুলো ক্রিটিক্যালি প্রশংসিত হয়েছিল। বেনারসের এক পন্ডিতের ছেলের গল্প হোক কিংবা উত্তর প্রদেশের এক মিডল ক্লাস ফ্যামিলির ছেলের গল্প, তাদের স্টোরিটেলিং এ ছিল পারফেকশন।

কিন্তু ‘জিরো’ তে সব কিভাবে যেনো গুলিয়ে গেলো। এই বছর খানদের ব্যর্থতার বছর হলেও এই বছর সিনেমা চলেছে শুধুমাত্র গল্পের জোরে। ‘বাধাই হো’ অথবা ‘আন্ধাধুন’ তাঁর শক্ত প্রমাণ। 

জিরো মুভি নিয়ে কথা বলার আগে চলুন একটু ঘাটি এবার খানদের ব্যর্থতা নিয়ে। সালমান খান প্রতিবার ইদে ব্লকবাস্টার মুভি দেন এবং এবারো দিয়েছেন। কিন্তু এবার ‘রেস ৩’ সালমানসুলভ আয় করতে পারেনি। ৩০০ কোটির ক্লাবে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই মুভিকে আমি বলব ‘আবর্জনা’। এর একটা বড় কারণ আমি মনে করি, সালমান খানের স্বজনপ্রীতি কিংবা ডিরেক্টর রেমো ডি’সুজাকে নিযুক্ত করা। রেমো ডি’সুজা তাঁর ‘এবিসিডি’ ফ্র্যাঞ্চ্যাইজ নিয়ে সিনেমা হিট করতে পারলেও সেগুলো ইংলিশ মুভি সিরিজ ‘স্টেপ আপ’ এর বলিউড ভার্সন। এই লোকের হাতে কিভাবে থ্রিলার গেলো বুঝে পাই না। সাকিব সেলিম ও ডেইজি শাহ কি অভিনয়ের ‘অ’ জানেন? কিংবা ববি দেওল নিজে কি কখনো সলো হিট দিয়েছেন? দিলেও বর্ডার ছাড়া আমার আর কিছু মনে পড়ে না। তাঁর উপর স্টোরি ভয়ানক দুর্বল। যদি শুধু সালমানকে দেখতে যান তাহলে এই মুভি ভালো লাগতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ‘থাগস অফ হিন্দুস্তান’ একই ভুলের মাশুল দিয়েছে। ভুল পরিচালককে নেওয়া তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। বিজয় কৃষ্ণ আচার্য এর ক্যারিয়ারে বেসিক্যালি কোনো হিট মুভি নেই। ‘ধুম-৩’র কথা বলবেন? হাহ! ওইটা তো হিট হয়েছিলো শুধুমাত্র আমির খানের স্টার পাওয়ার এবং ‘ধুম’ ব্র্যান্ডের জন্য। অমিতাভ বচ্চন, আমির খানের মতো অভিনেতা পাওয়ার পরেও মুভি সফল বানাতে না পারলে সেটার দায় পরিচালকের ঘাড়েই যায়।

কিন্তু শাহরুখ খানের তো এখানে কোনো ভুল ছিল না। এই মুহূর্তে ওয়ান অফ দ্যা বেস্ট রাইটার-ডিরেক্টর জুটি এবার তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছে। ভুল কোথায়? চলুন, একটু পর্যালোচনা করি।

শুরুটা হয় ভারতের এক ছোট শহর মিরাটের এক মোটামুটি সচ্ছল পরিবারের ‘বাউয়া সিং’ কে দিয়ে যার উচ্চতা ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি অর্থাৎ সে একজন বামন। কিন্তু বামন হওয়াটাকে সে দুর্বলতা মনে করে না। সে নিজেকে নিয়ে অনেক কনফিডেন্ট এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক সাহসী। ৩৮ বছর হয়ে গিয়েছে তাঁর কিন্তু এখনো কোনো পাত্রী পাননি। অবশেষে পাত্রী পান যার নাম ‘আফিয়া’ যে কিনা ‘সেরেব্রাল পলিসি’তে আক্রান্ত এবং ‘নাসা’র টপ লেভেলের বিজ্ঞানী। খালি চোখে তাঁদের লিগ সম্পূর্ণ আলাদা হলেও, বাউয়া সিং কোনো না কোনো ভাবে আফিয়াকে পটিয়ে ফেলেন এবং তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হলেও বাউয়া সিং আফিয়াকে নিয়ে খুশি হোন না এবং ভাগ্যক্রমে তাঁর ববিতা কুমারী অর্থাৎ ক্যাটরিনার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে কিন্তু তা বেশিক্ষণ চলে না। বাকিটুকু আমি বলবো না, বললে বলবেন স্পয়লার দিয়ে দিয়েছি।

অভিনয়ে শাহরূখ তাঁর সেরা দিয়েছেন। একবারও মনে হয়নি চরিত্রটি ফিকে হচ্ছে। তাঁর ডায়লগগুলো ছিল শোনার মতো। তিনি তাঁর জায়গা থেকে সেরা দিয়েছেন। আনুশকা শর্মা সত্যি বলতে গেলে তাঁর ন্যাচারাল অভিনয় করেননি। এটা বলতেই হবে, তাঁর অভিনয় ‘আনুশকা’ সরূপ ছিল না। তবে খারাপ করেননি তিনি। এরকম চরিত্র কল্কি কোচেলিন “মারগারিটা উইথ আ স্ট্র”তে সেরা দিয়েছিলেন। সেরেব্রাল পলিসিতে আক্রান্ত রোগীর চরিত্রে আনুশকা থেকে কল্কিকে এগিয়ে রাখব। জিশান আইয়ুব সবসময়ের মতো পার্শ্বচরিত্রে ভালো অভিনয় করেছেন। বাউয়া সিংয়ের বাবার চরিত্রে তিগমাংশু ঢুলিয়া ভালো অভিনয় করেছেন।

কিন্তু সত্যি বলতে গেলে, এ চলচ্চিত্রের স্ট্যান্ডআউট পারফরম্যান্স ছিল ক্যাটরিনার। ফাটিয়ে দিয়েছেন বলতে গেলে। কাজল মাখা চোখ-মুখ, প্রেমে বারবার ব্যর্থ ববিতা কুমারীর চরিত্রে it was one of her best acting I have ever seen.

অভিনয় ভাল ছিল, ডিরেক্টিং ভালো ছিল কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিন্তু হতাশ স্টোরিটেলিংয়ে। ফার্স্ট হাফ ছিল অসাধারণ। কখন শেষ হলো নিজেও বুঝতে পারিনি। কিন্তু ঝামেলা পেকেছে সেকেন্ড হাফে। মিরাট থেকে মঙ্গল। তাঁর মধ্যে সালমান খান, দীপিকা, আলিয়া, কাজল, শ্রীদেবীর ক্যামিও। পুরো জগাখিচুড়ি। চলচ্চিত্র বানানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাপার হলো ‘গ্লু সিন’ থাকা যা স্টোরিকে বেধে রাখে কিন্তু সেকেন্ড হাফে তাঁর অভাব ছিলো খুব বেশি। ১,২,৩,৪ বলে আকাশ থেকে তারা ফেলে দেওয়া- নাহ! খুব বেশি কাল্পনিক ব্যাপার স্যাপার। এও কি হয় কখনো। পর্দায় শাহরুখ খান বলে সব গিলবো?

জিরো আমার কাছে ভালোও না, খারাপও না। অ্যাভারেজ মুভি বলা যায়। শাহরুখ খান না থাকলে অ্যাভারেজও বলতাম না। বরং আমাকে অ্যাভারেজ বলতে বাধ্য করেছে ক্যাটরিনার অভিনয়। হতাশ পুরোপুরি স্টোরিতে। Dear writer, You just can’t make a movie with Shahrukh Khan with such bad plotline.

দিনশেষে এটাই বলব, মুভিটি দেখুন এবং নিজে বিচার করুন। আরেকটা আশার ব্যাপার বলিউডকে নিয়ে বলা যায়, এখন আর স্টার পাওয়ার এর যুগ নেই। গল্পই সব।

 

আরও কিছু মুভি রিভিউ পড়ুন:

এক অপ্রশংসিত প্রেমের চলচ্চিত্র লায়লা মজনু’র গল্প

প্রিয় জয়া আহসান! দেবী সিনেমার পর ‘নিশীথিনী’ আপনাকেই করতে হবে!

ইরাক আমেরিকা যুদ্ধের গোপন কাহিনী নিয়ে সিনেমা গ্রিন জোন(২০১০)


                                       

Share this

Leave a Comment